ঢাকা, বৃহস্পতিবার,২৮ মে ২০২০

উপমহাদেশ

কী হচ্ছে নেপালের চীনপন্থী সরকারের অন্দরমহলে?

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

২৮ এপ্রিল ২০১৮,শনিবার, ১৭:১৯


প্রিন্ট
নেপালে কমিউনিস্ট জোটে কোন্দল

নেপালে কমিউনিস্ট জোটে কোন্দল

নেপাল শাসন প্রশ্নে ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টি ও তার জুনিয়র শরিক- মাওবাদীদের মধ্যকার দ্বন্দ্বকে বিশ্লেষকেরা ‘স্থায়ী বিশৃঙ্খলা’ বলে অভিহিত করেছেন। ২২ এপ্রিল বিকেল বেলা নেপালের দুই বৃহত্তম কমিউনিস্ট পার্টির শীর্ষ নেতারা কাঠমন্ডুর জীর্ণশীর্ণ জাতীয় পরিষদ হলে সমবেত হন। দিনটি তাদের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কারণ সেদিন ছিল ভøাদিমির লেনিনের ১৪৮তম জন্মদিন। রাশিয়ার কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা লেনিনকে নেপালের বিপ্লবী কমিউনিস্টরা তাদের আদর্শিক নেতা বলে মনে করেন।


তবে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে সেদিন অনুষ্ঠানস্থল রাষ্ট্রীয় সভাগৃহের দেয়ালে টাঙানো লেনিন ও অন্যান্য বিপ্লবী কমিউনিস্ট কার্ল মার্ক্স ও মাও সেতুংয়ের ছবি সংবলিত ব্যানার ছিল না। এর পরিবর্তে নেপালের পরলোকগত তিনজন অগ্রবর্তী কমিউনিস্ট নেতার প্রতিকৃতি সংবলিত ব্যানার টাঙানো হয়েছিল। এর কারণ ১৫ বছর আগে সিপিএন-ইউএমএল লেনিন মার্কস ও মাওয়ের ছবি তাদের পতাকা ও অন্যান্য দলিল থেকে সরিয়ে ফেলেছিল। এর পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে একদল ক্রুদ্ধ মাওবাদী সদস্য মঞ্চে উঠে ব্যানারটি ছিঁড়ে ফেলে। ওই ব্যানারে নেপালের প্রধানমন্ত্রী খাদগা প্রাসাদ শর্মা অলিসহ সিনিয়র নেতাদের ছবি ছিল। অলি ও মাওবাদী নেতা পুষ্পকমল দাহালের মধ্যে কয়েক দিন ধরে আলোচনার পর আসন্ন ঐক্যের লক্ষ্যে সমর্থকদের শান্ত করতে লেনিনের জন্মদিনটিকে ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। পরে দুই ব্যানার টাঙিয়ে অনুষ্ঠান পুনরায় শুরু করা হয়। এ বিশৃঙ্খলায় নেপালের কমিউনিস্টদের ঐক্য গড়া যে বেশ কঠিন তা প্রকাশ পেয়েছে বলে বিশ্লেষকেরা জানান।


গত অক্টোবরে সিপিএন-ইউএমএল ও মাওবাদীরা নির্বাচনী জোট গঠন করে এবং ভবিষ্যতে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ঘোষণা দেয়। এর ফলে গত বছর নতুন সংবিধানের আওতায় অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তারা জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। পার্লামেন্টের সবচেয়ে বড় দল সিপিএন-ইউএমএলের নেতা হিসেবে অলি প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন এবং মাওবাদীরা এ জোট সরকারের জুনিয়র শরিক হিসেবে কাজ করছে। নির্বাচনে দুই দল ৬০-৪০ আসন ভাগাভাগি করার চুক্তি করেছিল কিন্তু ফলাফলে দেখা যায় যে, সিপিএন-ইউএমএল ৭০ শতাংশ আসনে জয়ী হয়েছে।

দুই দলের পার্থক্য
রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক সম্মৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি দিয়ে জোটটি নির্বাচনে জয়ী হয়েছে। তারা একটি স্থিতিশীল সরকারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যাতে তা তার পাঁচ বছরের মেয়াদ পুরা করতে পারে। দেশটিতে দুই দশকের সংসদীয় গণতন্ত্রে কোনো সরকারের মেয়াদ পুরো করার ঘটনা বিরল। যুদ্ধের পর দশ বছর ধরে চলা শান্তি থেকে জনগণ সুফল পেতে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। ২০০৬ সালে নেপালে মাওবাদীদের সূচিত যুদ্ধের অবসান ঘটে। ওই যুদ্ধে প্রায় ১৬ হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। এ ছাড়া নেপালিরা চরম দারিদ্র্য ও দীর্ঘকাল ধরে চলা উন্নয়নহীনতার অবস্থা থেকে তাদের দেশ মুক্ত হোক তা দেখতে চায়।

মাওবাদীদের একজন প্রভাবশালী নেতা মানি থাপা। তিনি আলজাজিরাকে বলেন, দুই দলের মধ্যকার মতপার্থক্য নিরসন করা সহজ হবে না। কারণ মাওবাদীরা সব সময়ই বিদ্রোহী হিসেবে কাজ করেছে। তিনি বলেন, তারা অধিকাংশ সময়ই মূলধারার রাজনীতির বাইরে থেকেছে। সরকার পরিচালনার ব্যাপারেও তাদের তেমন অভিজ্ঞতা নেই। এ ছাড়া তারা কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও পারদর্শী নয়।
থাপার মতে, অন্য দিকে সিপিএন-ইউএমএল উপদলটি অনেকটা বেসরকারি সংস্থা বা এনজিওর মতো এবং সরকার পরিচালনার ব্যাপারে অভিজ্ঞ। সিপিএন-ইউএমএলের ভিত্তি হলো সমধ্যবিত্ত ও নি¤œবিত্ত শ্রেণী আর মাওবাদীদের ভিত শ্রমিক শ্রেণীর ভেতরে। অবশ্য তাদের অনেক নেতা কয়েক বছরে বেশ ধনাঢ্য ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষক বিষ্ণু সাপকোটা মনে করেন যে, রাজনীতি তাদেরকে অদ্ভুত জোটে পরিণত করেছে। এ প্রসঙ্গে তিনি কয়েক বছর আগে অলির মাওবাদীদেরকে চ্যালেঞ্জ করার কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, (মাওবাদীদের) বিদ্রোহের প্রশ্নে দুই দলের মধ্যে বেশ তাৎপর্যপূর্ণ মতপার্থক্য রয়েছে।

পারস্পরিক সন্দেহ
সাপকোটার মতে, নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় দুই দলের জন্য একটি অভিন্ন ক্ষেত্র অর্জনের পথ খোলাসা করেছে। জনগণ সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন প্রাপ্তি নিশ্চিত করার মাধ্যমে তাদের জোটবদ্ধতাকে অনুমোদন করেছে। পরিস্থিতি তাদের আলাদা চিন্তা থেকে সরে এসে ঐক্যবদ্ধ হতে বাধ্য করেছে। তবে তিনি সতর্ক করে দেন যে, দুই দলের নেতাদের বড় অংশই পরস্পরকে সন্দেহের চোখে দেখে থাকে। বর্ণভিত্তিক গ্রুপ পরিত্যাগ করে মাওবাদী আন্দোলনে যোগদানকারী গোপাল কিরাতি এবং প্রখ্যাত দলিত আন্দোলনকারী বিশ্ব ভক্ত দুলালের মতো মাওবাদী নেতারা ঐক্যের বিরোধিতা করবেন বলে সাপকোটা অভিমত ব্যক্ত করেন।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা আরো লক্ষ করেন যে, অলি ও দাহাল তাদের রাজনৈতিক চুক্তি থেকে সরে গেছেন। কাঠমান্ডুর নেপালি ভাষার দৈনিক নাগরিকে রাজনৈতিক বিষয়ে লেখে থাকেন মনি দাহাল। তিনি লিখেছেন, ‘অলি তার রাজনৈতিক উদেষ্টাদের কথা কদাচিৎ শুনে থাকেন এবং তিনি কট্টরপন্থী হিসেবে পরিচিত। একটি সূত্র জানায়, দুই নেতা তাদের রাজনৈতিক জীবনকে আরো এগিয়ে নিতে রাজনৈতিক ঝুঁকি নিতে আগ্রহী। তবে এ ক্ষেত্রে দাহাল তার সুসংগঠিত দলের নেতাদের সাথে প্রায়ই সলাপরামর্শ করেন।

মাওবাদী নেতা দাহালের কথা প্রতিধ্বনি করে থাপা বলেন, ঐক্য অবশ্যই সমতার ভিত্তিতে হতে হবে। বাধা সত্ত্বেও থাপা আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে। তিনি বলেন, ‘শিগগিরই দুই দলকে একীভূত করা হয়তো সম্ভব হবে না, তবে আমাদের অবশ্যই আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে, কেননা আমরা উভয় দলই সংবিধানে উল্লেখিত সমাজতান্ত্রিক লক্ষ্য অর্জন করতে চাই।’ সূত্র : আলজাজিরা

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫