ঢাকা, রবিবার,৩১ মে ২০২০

মতামত

কমনওয়েলথ গুরুত্বপূর্ণ মোড় পরিবর্তনের দ্বারপ্রান্তে

জিতেশ কিশোর কুমার গাধিয়া ও টম টুজেন্ডহ্যাট

২৮ এপ্রিল ২০১৮,শনিবার, ১৮:১২ | আপডেট: ২৮ এপ্রিল ২০১৮,শনিবার, ১৮:৫৭


প্রিন্ট
কমনওয়েলথ গুরুত্বপূর্ণ মোড় পরিবর্তনের দ্বারপ্রান্তে

কমনওয়েলথ গুরুত্বপূর্ণ মোড় পরিবর্তনের দ্বারপ্রান্তে

প্রায় সাত দশক পর এখন ৫৩টি দেশের অনেক বড় এই পরিবারের (কমনওয়েলথ) নেতারা লন্ডনে ২৫তম সভায় মিলিত হয়েছেন। পুনরায় সবার দৃষ্টি এখন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর ওপর। নরেন্দ্র মোদি কিংবা তার পূর্বসূরি ড. মনমোহন সিংহ গত তিনটি কমনওয়েলথ শীর্ষ সম্মেলনে যোগদান করেননি। নেহরুর মতোই মোদিও কমনওয়েলথের প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে লড়াই করছেন। এর পরিবর্তে তিনি তার ঘনিষ্ঠ মিত্রদের সার্কেলে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, আসিয়ান এবং ক্রমবর্ধমানভাবে ইসরাইলের দিকে নজর রাখছেন

ইতিহাসের নিজে নিজেই পুনরাবৃত্তি ঘটার একটি কৌতূহল উদ্দীপক স্বভাব রয়েছে। ১৯৪৯ সালে ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওয়াহেরলাল নেহরু কমনওয়েলথ সরকারপ্রধানদের চতুর্থ সভায় যোগদান করার জন্য ব্রিটেনে এসেছিলেন। ক্লিমেন্ট অ্যাটলি ছিলেন তখন ওই সভার আয়োজক। সেখানে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, সিলোন (শ্রীলঙ্কা), নিউজিল্যান্ড, পাকিস্তান ও দক্ষিণ আফ্রিকার নেতারাও যোগ দিয়েছিলেন। তখন এই রাষ্ট্রগুলোর সবাই ব্রিটেনের রাজা বা রানীকে মেনে নিয়েছিলেন রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে ।

উল্লিখিত দেশগুলোর নেতাদের মধ্যে নেহরু কমনওয়েলথের ব্যাপারে সন্দেহপ্রবণ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি রাজকীয় শাসনের সর্বশেষ স্মারক ত্যাগ করতে আগ্রহী ছিলেন। সব ঔপনিবেশিক সম্পর্ক বা চুক্তি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে তাকে জোটনিরপেক্ষ একটি পৃথক পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন এবং রাশিয়া ও চীনের মতো দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলারও অনুমতি দেয়া হয়।

ভারত ১৯৫০ সাল থেকে যেভাবে একটি প্রজাতন্ত্র হিসেবে গড়ে ওঠার পরিকল্পনা করেছিল, সেভাবেই তা দৃশ্যমান এবং অগ্রসর হয়। মাউন্টব্যাটেনের নেতৃত্বে ব্যাপক প্রচারণার পরিপ্রেক্ষিতে নেহরু আলোচ্য সংস্থাটির দরজা উন্মোচিত করেন। সংস্থাটি এই ভাবনা থেকে গড়ে তোলা হয় যে, ভবিষ্যতে হয়তো এর একটি গ্রহণযোগ্য ফর্মুলা পাওয়া যাবে।

নেহরু ভারতের ক্ষোভ নিবারক ভূমিকা পালন করাটা দেশটির জন্যে কতটুকু রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুবিধাজনক তা পুনর্মূল্যায়ন করতেও শুরু করেন। নেহরুর মানসিকতায় সম্ভবত মহাত্মা গান্ধীর ‘ভুলে যাও এবং মাফ করে দাও’ দর্শন কাজ করেছে।

তাই লন্ডন ঘোষণার মূল বিষয়ে একত্রে রাষ্ট্রনায়কোচিত এবং মুসাবিদাকারী বিষয়টি উঠে এসেছে। এই ঘোষণায় কমনওয়েলথ দেশগুলোর এই সংগঠনে ‘ভারতের পূর্ণ সদস্য পদ অব্যাহত রাখার ইতিবাচক আকাক্সক্ষা এবং কমনওয়েলথভুক্ত স্বাধীন দেশগুলোর সদস্যদের সমন্বয়ে যে সংস্থা গড়ে উঠবে, তাতে রাজাকে প্রতীকীভাবে কমনওয়েলথ প্রধান’ হিসেবে মেনে নেয়ার বিষয়টি ফুটে উঠেছে। রাষ্ট্রীয় এক ভোজসভায় রাজা ষষ্ঠ জর্জ এক সরস জবাবে বলেছিলেন, ‘মি. নেহরু আপনি আমার অবস্থার বৈশিষ্ট্যপূর্ণ রূপান্তর ঘটিয়েছেন’ এবং তাই আধুনিক কমনওয়েলথের জন্ম হয়েছে।
ধারাবাহিকভাবে প্রত্যেক দেশ স্বাধীনতা অর্জন করবে বা একটি প্রজাতন্ত্রে পরিণত হবে। এসব দেশকে ভারতের নেতৃত্ব অনুসরণ করে এই ক্লাবে থাকতে হবে। রানী সিংহাসনে আরোহণ করে কমনওয়েলথের প্রধান হয়েছিলেন। উত্তরাধিকার সূত্রে নয়, অভিন্ন সম্মতির মাধ্যমেই তিনি এই সম্মান অর্জন করেন।

প্রায় সাত দশক পর এখন ৫৩টি দেশের অনেক বড় এই পরিবারের (কমনওয়েলথ) নেতারা লন্ডনে ২৫তম সভায় মিলিত হয়েছেন। পুনরায় সবার দৃষ্টি এখন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর ওপর। নরেন্দ্র মোদি কিংবা তার পূর্বসূরি ড. মনমোহন সিংহ গত তিনটি কমনওয়েলথ শীর্ষ সম্মেলনে যোগদান করেননি। নেহরুর মতোই মোদিও কমনওয়েলথের প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে লড়াই করছেন। এর পরিবর্তে তিনি তার ঘনিষ্ঠ মিত্রদের সার্কেলে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, আসিয়ান এবং ক্রমবর্ধমানভাবে ইসরাইলের দিকে নজর রাখছেন।

ভারতের সক্রিয় সংযুক্তি ছাড়া কমনওয়েলথ তার প্রভাবশালীদের ছায়া বা প্রতিমূর্তিতে পরিণত হবে। সম্মিলিতভাবে কমনওয়েলথের ২ দশমিক ৪ বিলিয়ন বা ২৪০ কোটি জনসংখ্যার মধ্যে অর্ধেকেরও বেশির প্রতিনিধিত্ব করছে ভারত। একই সাথে, এই ফোরামের ব্রিটেন বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ। ৬৬ বছর পর রানীর উত্তরসূরি হিসেবে নতুন কারো আগমনও প্রায় আসন্ন ছিল।

কমনওয়েলথ এখন আরেকটি মোড় নেয়ার দিকে যাচ্ছে। ভারতীয়রা মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করছেন : কমনওয়েলথ কী জন্য? তবে উদাহরণস্বরূপ, যুক্তরাজ্য জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদে কমনওয়েলথের একমাত্র সদস্যদেশ হিসেবে ভূমিকা পালন করতে পারে। সাধারণ পরিষদেও ব্রিটেন ভূমিকা রাখতে পারে। সামরিক সহযোগিতার অবকাঠামো এবং অভিন্ন স্বার্থ সংজ্ঞায়িত না করে কমনওয়েলথ ন্যাটোর মতো একটি বহুমুখী প্রতিরক্ষা চুক্তি সম্পাদন করতে পারে না। তবে কমনওয়েলথ বিকল্প হিসেবে কেবল অর্থনৈতিক সহযোগিতায় এগিয়ে আসতে পারে।

উন্নতির বিষয়ে সাড়ম্বরে আলোকপাত করলে সেটা ব্রিটিশ অ্যাজেন্ডার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। কমনওয়েলথের সম্মিলিত জিডিপি ১০ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি। এতে বিশ্বের কয়েকটি দ্রুততম বর্ধিষ্ণু দেশ এবং অঞ্চলও রয়েছে। আন্তঃকমনওয়েলথ বাণিজ্য ও বিনিয়োগ-২০২০ সাল নাগাদ ১ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে বলে তুলে ধরা হয়েছে। এটা উন্নয়নশীল অর্থনীতির মধ্যকার দক্ষিণ-দক্ষিণ কার্যক্রমের দ্রুত বর্ধমান করিডোরের জন্য ‘তরল পদার্থ নিষ্কাশনের জন্য একটি নালা’ হতে পারে। উন্নয়নশীল অর্থনীতি এখন বিশ্বের এক চতুর্থাংশ বাণিজ্যের প্রতিনিধিত্ব করেছে। তাই উন্নতি, সাফল্য বা সমৃদ্ধির কর্মসূচি আপাতদৃষ্টিতে ন্যায়সঙ্গত। তবে এটা এককভাবে কার্যকর করা যাবে না। ব্রিটেনকে অবশ্যই দেখাতে হবে, অপর ৫২ সদস্যদেশ হচ্ছে কমনওয়েলথের নতুন কেন্দ্রবিন্দু। এসব দেশ কেবল ব্রেক্সিটের সুযোগ সন্ধানের প্রতিষেধক নয়। বরং এটা হচ্ছে ব্রিটিশ সরকারের হৃদয়ের সত্যিকারের পরিবর্তন।’ এখানে পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটি কমনওয়েলথের সাথে যুক্তরাজ্যের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি ‘দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি’ গ্রহণ করার আহ্বান জানিয়েছে। ব্রিটেন থেকে কমনওয়েলথ সদস্যরা কী আশা করতে পারে তা স্পষ্টভাবে জানতে চেয়েছে কমিটি।
প্রধানমন্ত্রী মোদি নির্বাচন-পূর্ব একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে প্রবেশ করার কারণে নিশ্চিতভাবে অবশ্যই বাণিজ্য এবং বিনিয়োগকে অধিক স্বাগত জানাচ্ছেন। তার অর্থনৈতিক সংস্কার হবে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।

উচ্চাভিলাষী ভারত ক্রমেই অস্থির হয়ে উঠছে। স্বল্পমেয়াদি নির্বাচনী দিগন্তের বাইরে একটি বিস্তৃত ভূ-রাজনৈতিক পুরস্কারও রয়েছে। খুব কম আন্তর্জাতিক ফোরাম রয়েছে, যেখানে ভারত অন্যান্য উদীয়মান সুপার পাওয়ারের সাথে প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হচ্ছে না। এটা আফ্রিকায় প্রাসঙ্গিক হতে পারে। যেখানে কমনওয়েলথের ১৯টি সদস্যদেশ ভারতকে ওই অঞ্চলে ভারসাম্য রক্ষাকারী শক্তি হিসেবে কাজ করার অনুমতি দিয়েছে। আরো খোলামেলাভাবে বলতে হয়, আন্তর্জাতিক নিয়ম হচ্ছে- ভারতের মতো নতুন ‘চ্যাম্পিয়ন’দের তীব্র প্রয়োজন।

গত নভেম্বরে প্রিন্স অব ওয়েলস নয়াদিল্লি সফর করেছেন। তিনি প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাথে বৈঠকে মিলিত হন। তিনি তার প্রিয় আঙ্কেল ডিকির (মাউন্টব্যাটেন) পদাঙ্ক অনুসরণ করে একজন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীকে কমনওয়েলথের প্রশংসনীয় গুণ বা উৎকর্ষ সম্পর্কে বোঝানোর মিশন নিয়ে ভারত সফর করেন। সব দিক দিয়ে ওই বৈঠক ছিল উষ্ণ ও বন্ধুত্বপূর্ণ এবং ওটা লন্ডনের নতুন ঘোষণার পরিচয় নির্দেশক হতে পারে।

ভারত বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নেতৃস্থানীয় ভূমিকা পালন করতে পারে এবং কমনওয়েলথের কেন্দ্রবিন্দু লন্ডন থেকে পরিবর্তন করতে পারে। ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের জন্য ভারতীয়রা যেমন পরিবারগুলোকে উপলব্ধি করতে পারে, একটি ‘পারিবারিক ব্যবস্থাপনার’ প্রয়োজনীয়তা বুঝতে পারে এবং এ ধরনের উপলব্ধির মাধ্যমে হয়তো প্রায় ৭০ বছর আগের নেহরুর কথার উদারভাবে পুনরাবৃত্তি ঘটাতে পারে। প্রিন্স চার্লসকে কমনওয়েলথের পরবর্তী প্রধান হিসেবে গ্রহণ করতে পারে।

লেখক : লর্ড গান্ধী ব্রিটিশ-ইন্ডিয়ান বিনিয়োগকারী ব্যাংকার এবং ব্যবসায়ী, ইউকে-ইন্ডিয়া সিইও ফোরামের সদস্য। টম টুজেন্ডহ্যাট এমপি, হাউজ অব কমন্স পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির চেয়ারম্যান।
দি টেলিগ্রাফ গ্রুপ লিমিটেড, লন্ডন, থেকে ভাষান্তর : মুহাম্মদ খায়রুল বাশার

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫