ঢাকা, রবিবার,৩১ মে ২০২০

মতামত

শিক্ষার অভাব

অধ্যাপক রায়হান উদ্দিন

২৯ এপ্রিল ২০১৮,রবিবার, ১৮:৫৯


প্রিন্ট
শিক্ষার অভাব

শিক্ষার অভাব

মানুষ সহজাত অনুসন্ধিৎসু মন নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। এর সুষ্ঠু বিকাশসাধন করাই হলো শিক্ষালাভ। সমাজে মেট্রিক, আইএ, বিএ, এমএ, ইঞ্জিনিয়ারিং, ডাক্তারি প্রভৃতি পরীক্ষায় পাস করা লোকের অভাব নেই। তাদের শিক্ষিত বলে ধরে নেয়া হয়। শিক্ষিত লোকের যে মাপকাঠি উল্লেখ করেছি, সেই মোতাবেক তাদের মূল্যায়ন করা হোক। সহজাত অনুসন্ধিৎসা অর্থাৎ প্রকৃতিপ্রদত্ত গুণেরও বিকাশ না ঘটিয়ে একে ভোঁতা ও অকেজো করে ফেলা হয়। যেমন, কেমিস্ট্রিতে পড়াশোনা করার পর ব্যাংকের ম্যানেজার হওয়া, মেরিন বায়োলজিতে পড়াশোনা করার পর ওকালতি কিংবা ব্যবসায় করা ইত্যাদি। এটা অস্বাভাবিক নয় কি?

এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা দরকার, শিক্ষিত বলতে কী বুঝায়, সে বিষয়ে বিশেষত এই উপমহাদেশে ভুল ধারণা রয়েছে। বহু ক্ষেত্রে নিছক সাক্ষরকে শিক্ষিত হিসেবে ধরা হয়। এমনকি, সরকারও অনেক সময় তা করে থাকে। কিন্তু সাক্ষর ও শিক্ষিত সমার্থক হতে পারে না কিছুতেই। শিক্ষিত কথাটা অনেক ব্যাপক, যথার্থ শিক্ষিত হতে হলে বহু সাধনার প্রয়োজন। সেই হিসেবে তুলনা করতে গেলে এ দেশে সাক্ষরের হার যদি শতকরা ২০ হয়, শিক্ষিতের হার বোধকরি দুই শতাংশও হবে না।

কোনো শিক্ষক তার শিক্ষার্থীদের সব কিছু শিখিয়ে দিতে পারেন না। Student is not a vessel that to be filled. জ্ঞানের কোনো সীমা নেই। শিক্ষকের কাজ হলো ছাত্রদের মধ্যে বোধশক্তি সৃষ্টি করে, তার জ্ঞানের আগ্রহকে সমৃদ্ধ করে তোলা। পৃথিবীর চিত্র তার সামনে তুলে ধরে তাকে সেদিকে আহ্বান করতে হয়। বলতে হয় এদিকে এসো, এখানে তোমার সম্ভাবনা বা ভবিষ্যৎ। এখানে তোমার মেধা-প্রতিভার বিকাশের সুযোগ। এই পুরো কাজটাই তাকে করতে হয় কথার মাধ্যমে। তাই শিক্ষকের জীবনে বক্তব্যের গুরুত্ব খুব গুরুত্বপূর্ণ। এই জন্য তার কথা বলার উঁচু মাপের দক্ষতা থাকতে হয়, তা না হলে এই অসাধ্য সাধন করা, উঁচু মানের শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করা সম্ভব হয় না।

কিন্তু এ দেশে শিক্ষার নামে বিপরীত কাজটিই করা হয়। শিক্ষার্থীকে পরীক্ষা পাসের জন্য কিছু বুঝে, বেশির ভাগ না বুঝে প্রশ্নোত্তর মুখস্থ করতে হয়। অনেকে না বুঝে বাংলা থেকে ইংরেজি অনুবাদ মুখস্থ করে। এভাবে মানব সন্তানকে তোতা পাখি বানানো হয়। না বুঝে উত্তর মুখস্থ করে যারা পরীক্ষা পাস করে, সেই তোতা পাখিদের কি শিক্ষিত বলা চলে? টিউটররা যেন তেন প্রকারে কতগুলো সম্ভাব্য প্রশ্নের উত্তর শিখিয়ে ওদের গোল্ডেন ‘এ’ প্লাস পাইয়ে দেন। পরবর্তী সময় উচ্চতর পড়াশোনার জন্য নেয়া ভর্তি পরীক্ষায় তারা ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসে। কাজেই তার ‘নির্ভরযোগ্য আশ্রয়’ হয়ে দাঁড়ায় হয় প্রশ্নপত্র ফাঁস কিংবা নকলবাজি। বেশ কিছু দিন আগে কোনো একটা টিভি চ্যানেলে দেখানো হচ্ছিল, দুষ্টচক্র টাকার বিনিময়ে কিভাবে এসআইএফ ফরম জালিয়াতি করে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্ট্রংহোল্ডরুম থেকে উত্তরপত্র পাল্টানোর মতো অপকর্ম করে থাকে। এভাবে অনেক মেধাবী ছেলেকে পেছনে ফেলে গাধা ছেলেদের গোল্ডেন এ প্লাস পাইয়ে দেয়ার বিষয়টি সত্যি আমাদের ভাবিয়ে তোলে।
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা নানা দিক থেকে অবক্ষয়ের শিকার। শিক্ষাগৃহ আজ স্কুলগৃহ থেকে শিক্ষকের বাড়িতে স্থানান্তরিত হয়ে গেছে। প্রায় প্রত্যেক শিক্ষকের বাসাই যেন এক-একটি দোকান। কারণ যেনতেন প্রকারে স্কুলের ক্লাস সেরে বাড়ি কিংবা কোচিং সেন্টারে এক দল ছাত্রছাত্রীকে পড়াতে পারলে অনেক টাকা। মুক্তবাজার অর্থনীতির আদর্শে সেখানে বিদ্যার অবাধ ব্যবসায় বা বেচাকেনা চলছে। কোনো কোনো শিক্ষকের বাড়ি যেন একটি সুপার মার্কেট।

এতে করে অভিভাবকেরা একজন আদর্শ শিক্ষক এবং কোচিং সেন্টারের শিক্ষককে এক করে ফেলেছেন। অভিভাবকেরা চাচ্ছেন শিক্ষকেরা তাদের সন্তানদের পরীক্ষায় ‘ভালো’ নম্বর পাওয়ার সব রকম চেষ্টা করুন। এটাই তাদের প্রকৃত সাফল্য, তাদের সার্থকতা। ছাত্রছাত্রীদের আজ আর কেউ শিক্ষার্থী হিসেবে দেখতে চান না। চাচ্ছেন পরীক্ষার্থী হিসেবে। একজন শিক্ষকের কাজ বা দায়িত্ব ছাত্রকে কেবল ভালো নম্বর পাওয়ার উপযুক্ত করে তোলা নয়। এটা যিনি করেন তাকে আসলে শিক্ষক বলা যাবে না। ইংরেজি ভাষায় তার নাম হচ্ছে Tutor. তিনি টিউটর বা কোচিং সেন্টারের ইনস্ট্রাকটার। কিন্তু তিনি শিক্ষক নন। শিক্ষক টিউটরের চেয়ে অনেক বড়। শিক্ষক পড়ানোর বিষয়টি তুলে ধরার পাশাপাশি ছাত্রের হৃদয়ে ওই বিষয়টির প্রতি ভালোবাসা জাগিয়ে তুলতে চেষ্টা করেন। যে বিষয়ে শিক্ষক পড়ান, সে বিষয়টি ঘিরে শিক্ষকের মধ্যে যে আনন্দ আর ভালোবাসার জন্ম হয়েছে সেটা তাকে যথাযথ ভাষায় ছাত্রের হৃদয়ে সঞ্চার করতে হবে। এটা যদি তিনি না পারেন তবে তিনি কখনই সফল হবেন না। যত বড় আর ছোটমাপের শিক্ষকই হোন, তাকে সুন্দর অনবদ্যভাবে কথা বলতে হবে, না হলে শিক্ষক হিসেবে তিনি ব্যর্থ হয়ে যাবেন। যদি কথার মধ্যে লালিত্য ও প্রসাদগুণ না থাকে, তাহলে তিনি যথার্থ শিক্ষক হতে পারেন না।

এখন তাদের কথায় আসি, যারা নিয়মিত পড়াশোনা শেষে পরীক্ষা পাস করে জীবিকা নির্বাহের জন্য চাকরি কিংবা অন্য পেশা অবলম্বন করেছেন। শিক্ষা জীবন শেষ হওয়ার পর তারা অনেকে মনে করেন, এখন তো ছাত্র নই, সংসারী মানুষ, বইপত্র পড়ার দরকার কী? এ রকম চিন্তা ব্যক্তির ও জাতির জীবনে সর্বনাশ ডেকে আনছে। শিক্ষাজীবন শেষ করে বইপত্র না পড়ার অর্থ দাঁড়ায় আপনি শিক্ষার পথ ছেড়ে একধরনের অশিক্ষার পথ অবলম্বন করেছেন এবং কিছু না শেখার পশ্চাদযাত্রা শুরু করেছেন। অন্যান্য প্রাণী এবং মানুষের মধ্যে পার্থক্য হলো, মানুষের মন বলে একটা কিছু আছে। মননশক্তি আছে। এই মনের নিরন্তর উৎকর্ষসাধনের জন্য সংগ্রাম করলেই জীবনের সফলতা আসবে। মানুষ পেটপুরে খেতে পায় না এ জন্য সমাজব্যবস্থাই দায়ী। আপনি যে শিক্ষিত লোক হয়েও বইপত্র না পড়াতে আপনার ক্ষতি হচ্ছে না বলে মনে করে থাকেন; আপনার মনকে উপবাসী রাখেন; মনের খোরাক সরবরাহ করেন না- এ জন্য সমাজব্যবস্থা দায়ী নয়, আপনি নিজেই দায়ী। ‘দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত জ্ঞানার্জন করো।’ এই হাদিসের শিক্ষা শিক্ষিত লোকেরা উপলব্ধি করেন না। যেসব শিক্ষিত লোক বইপত্র পড়েন না তাদের কতটা শিক্ষিত বলা যায়?

শিক্ষাব্যবস্থায় অবনতির কারণে চাকরিপ্রার্থীদের প্রশ্ন করে যে উত্তর পাওয়া যায় তা শুনলে কাঁদবেন না হাসবেন, বলা যায় না। আইএ পাস এক ছাত্র লিখেছে, প্যারিস হলো হিমালয়ের রাজধানী। শ্রীমঙ্গল ভারতে অবস্থিত। শ্রীমঙ্গল শ্রীলঙ্কার রাজধানী। চন্দ্রঘোনা খুলনায় অবস্থিত।’ এদের জ্ঞানের বহর দেখুন।

প্রখ্যাত লেখক প্রমথ চৌধুরী বলেছেন, ‘সুশিক্ষিত মানুষমাত্রই স্বশিক্ষিত।’ দুঃখ লাগে যখন কোনো চাকরিজীবী বা ব্যবসায়ী বন্ধু বলেন, ‘স্কুল কলেজে বইপত্র পড়তাম, এখন আর পড়ি না।’
নার্সারি থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত প্রায় ৩০টি বছর শিক্ষকতা করেছি। এর সাথে সঙ্গীতের ওপর শিক্ষকতা আজো করে চলেছি। জীবন নাটকের পঞ্চম অংকে পৌঁছে নানা হইচইয়ের মধ্যে দিনগুলো কেটে গেছে। দেশ-বিদেশের যত বিখ্যাত পুস্তক পড়া উচিত ছিল, তা যথাযথ পড়া হয়নি। তাই জ্ঞানী-গুণীদের সমাবেশে নিজেকে খুবই সঙ্কুচিত বোধ করি। এই ব্যর্থতা মনকে খুব নাড়া দেয়। তাই আমার চেয়ে যারা কম বয়সী তাদের বলি- সময় থাকতে জ্ঞানার্জন করো। সময় হলো শ্রেষ্ঠ সম্পদ। এর যথাযথ ব্যবহারে জাতির উন্নতি-অগ্রগতি নিহিত। জাতির জীবনে মূল্যবোধের চরম অবক্ষয় ঘটেছে। গ্রন্থ কেন্দ্রে মূল্যবান বইগুলো ‘বুড়ো প্রজাপতি’র মতো মুখথুবড়ে পড়ে আছে। এটা জাতির জন্য চরম বিপদ সঙ্কেত। বিভিন্ন সভা-সমিতিতে আমার প্রিয় ছাত্রদের বলিÑ বই হলো মনের খোরাক। যেসব শিক্ষিত লোক বইপত্র পড়েন না তারা তাদের মনকে উপবাসী রাখার জন্য অপরাধী। তারা সত্যিকার অর্থে শিক্ষিত নন।

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫