তাঁর আধ্যাত্মিক ভুবন

রাযী উদ-দীন কুরেশী

‘রবীন্দ্রনাথের ভক্তিমূলক কবিতা ও গান’ এ শিরোনামে একটি সঙ্কলন প্রকাশ করেছি আমি। প্রকাশিত হয়েছিলো ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে।
আধ্যাত্মিক জগতে রবীন্দ্রনাথের গভীর বিচরণ আমাকে আকুল করে। আমি গভীরভাবে দেখেছি। ভেবেছি। এবং দেখা ও ভাবনার আলোকে অনুধাবন করেছি। তার আধ্যাত্মিকতা অত্যন্ত গভীর এবং স্বচ্ছ। তার কবিতা গান তারই সাক্ষ্য বহন করছে। রবীন্দ্রনাথের আধ্যাত্মিক জগতে যে একবার প্রবেশ করবে সে বুঝবে তার বিশালতা, গভীরতা ও পরিধি। আমার সঙ্কলিত ‘রবীন্দ্রনাথের ভক্তিমূলক কবিতা ও গান সঙ্কলন’ বইয়ের প্রথম কবিতাটি নিম্নরূপ :
১. অচিন্ত্য এ ব্রহ্মাণ্ডের লোকলোকান্তরে
অনন্তশাসন যার চিরকালতরে
প্রত্যেক অণুর মাঝে হতেছে প্রকাশ,
যুগে যুগে মানবের মহা ইতিহাস
বহিয়া চলেছে সদা ধরণীর পর
যার তর্জনীর ছায়া, সেই মহেশ্বর
আমার চৈতন্য-মাঝে প্রত্যেক পলকে
করিছেন অধিষ্ঠান; তাহারি অলোকে
চক্ষু মোর দৃষ্টিদীপ্ত, তাহারি পরশে
অঙ্গ মোর স্পর্শময় প্রাণের হরষে।
যেথা চলি, যেথা রহি, যেথা বাস করি,
প্রত্যেক নিশ্বাসে মোর এই কথা স্মরি
আপন মস্তক- ‘পরে সর্বদা সর্বথা
বহিব তাহার গর্ব, নিজের নম্রতা।
তারপর রয়েছে অজস্র কবিতা আর গান, যেমন :
২. আমার মাথা নত করে দাওহে তোমার
চরণ ধুলার তলে।
সকল অহঙ্কার হে আমার
ডুবাও চোখের জলে।

আমার হিয়ার মাঝে লুকিয়ে ছিলে
দেখতে আমি পাইনি।
বাহিরপানে চোখ মেলেছি
হৃদয়পানেই চাইনি।

৩. আমার যে সব দিতে হবে সে তো আমি জানি
আমার যত বিত্ত প্রভু, আমার যত বাণী।

৪. এই করেছ ভালো, নিষ্ঠুর,
এই করেছ ভালো।
এমনি করে হৃদয়ে মোর
তীব্র দহন জ্বালো।
আমার এ ধূপ না পোড়ালে
গন্ধ কিছুই নাহি ঢালে,
আমার এ দীপ না জ্বালালে
দেয় না কিছুই আলো।

৫. কে বলে সব ফেলে যাবি
মরণ হাতে ধরবে যবে,
জীবনে তুই যা নিয়েছিস
মরণে সব নিতে হবে।
এই ভরা ভাণ্ডারে এসে
শূন্য কি তুই যাবি শেষে,
নেবার মতো যা আছে তোর
ভালো করে নে তুই তবে।

৬. তুমি যখন গান গাহিতে বলো
গর্ব আমার ভরে ওঠে বুকে,
দুই আঁখি মোর করে ছল ছল
নিমেষহারা চেয়ে তোমার মুখে।
কঠিন কটু যা আছে মোর প্রাণে
গলিতে চায় অমৃতময় গানে,
সব সাধনা আরাধনা মম
উড়িতে চায় পাখির মতো সুখে।
তৃপ্ত তুমি আমার গীতরাগে,
ভালো লাগে তোমার ভালো লাগে,
জানি আমি এই গানেরি বলে
বসি গিয়ে তোমারি সম্মুখে।
মন দিয়ে যার নাগাল নাহি পাই,
গান দিয়ে সেই চরণ ছুঁয়ে যাই,
সুরের ঘোরে আপনাকে যাই ভুলে,
বন্ধু বলে ডাকি মোর প্রভুকে।

৭. প্রেমের দূতকে পাঠাবে নাথ কবে
সকল দ্বন্দ্ব ঘুচবে আমার তবে।
আর যাহারা আসে আমার ঘরে
ভয় দেখায়ে তারা শাসন করে,
দুরন্ত মন দুয়ার দিয়ে থাকে,
হার মানে না, ফিরায়ে দেয় সবে।
সে এলে সব আগল যাবে ছুটে,
সে এলে সব বাঁধন যাবে টুটে,
ঘরে তখন রাখবে কে আর ধরে,
তার ডাকে যে সাড়া দিতেই হবে।

৮. আমারে তুমি করিবে ত্রাণ
এ নহে মোর প্রার্থনা,
তরিতে পারি শকতি যেন রয়।
আমার ভার লাঘব করি
নাই-বা দিলে সান্ত্বনা,
বহিতে পারি এমনি যেন হয়।
নম্রশিরে সুখের দিনে
তোমারি মুখ লইব চিনে,
দুখের রাতে নিখিল ধরা
যেদিন করে বঞ্চনা
তোমারে যেন না করি সংশয়।

৯. বৈরাগ্য সাধনে মুক্তি, সে আমার নয়
অসংখ্য বন্ধন-মাঝে মহানন্দময়
লভিব মুক্তির স্বাদ! এই বসুধার
মৃত্তিকার পাত্রখানি ভরি বারম্বার
তোমার অমৃত ঢালি দিবে অবিরত
নানাবর্ণগন্ধময়। প্রদীপের মতো
সমস্ত সংসার মোর লক্ষ বর্তিকায়
জ্বালায়ে তুলিবে আলো তোমারি শিখায়
তোমার মন্দির-মাঝে।
ইন্দ্রিয়ের দ্বার
রুদ্ধ করি যোগাসন, সে নহে আমার।
যে-কিছু আনন্দ আছে দৃশ্যে গন্ধে গানে
তোমার আনন্দ রবে তার মাঝখানে।
মোহ মোর মুক্তিরূপে উঠিবে জ্বলিয়া,
প্রেম মোর ভক্তিরূপে রহিবে ফলিয়া।
১০.
মাঝে মাঝে তব দেখা পাই, চিরদিন কেন পাই না?
কেন মেঘ আসে হৃদয়-আকাশে, তোমারে দেখিতে দেয় না।
ক্ষণিক আলোকে আঁখির পলকে তোমায় যবে পাই দেখিতে
হারাই- হারাই সদা হয় ভয়, হারাইয়া ফেলি চকিতে।
কী করিলে বলো পাইব তোমারে, রাখিব আঁখিতে আঁখিতে।
এত প্রেম আমি কোথা পাব নাথ, তোমারে হৃদয়ে রাখিতে?
আর কারো পানে চাহিব না আর, করিব হে আমি প্রাণপণÑ
তুমি যদি বল এখনি করিব বিষয়বাসনা বিসর্জন।
মহান সৃষ্টিকর্তা,মহাপ্রভুর প্রতি যে নিচ্ছিদ্র বিশ্বাস,ভক্তি, প্রীতির সম্পর্ক তার অজস্র বাণীতে প্রকাশিত তা কি রবীন্দ্রনাথের আধ্যাতিক উচ্চাসনের প্রমাণ নয়?
তিনি লিখেছেন ‘ভগবান, তুমি যুগে যুগে দূত, পাঠায়েছ বারে বারে’ তারপর, একই কবিতায় লিখলেন, ‘আজি এ দুর্দিনে ফিরানু তাদের ব্যর্থ নমস্কারে’। একি কোনো আত্মশ্লাঘার কারণে?

১১. সৃষ্টিকর্তা মানুষকে সৎ পথ প্রর্দশনের জন্য, তার কাক্সিক্ষত সুশীল সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য যে যুগে যুগে দূত পাঠিয়েছেন, তা বিশ্বাস করা সত্ত্বেও কোনো একজন প্রেরিত দূতের অনুসারী হতে কেন তার অনীহা ছিল। অবশ্য তিনি আরো লিখেছেন,
প্রেমের দূতকে পাঠাবে নাথ কবে,
সকল দ্বন্দ্ব ঘুচবে আমার তবে।
... তার ডাকে যে সাড়া দিতেই হবে।

তবে কি তিনি নূতন কোনো দূতের খোঁজে, অপেক্ষায় ছিলেন সকল দ্বন্দ্ব ঘুচাবার তরে? নাকি এ মৃত্যুদূত এর অপেক্ষা?
রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে আমার এ দ্বন্দ্বে কোনো জ্ঞানী ব্যক্তি আলোকপাত করলে আমি বাধিত হব। রবীন্দ্রনাথের এ আধ্যাত্মিক জগৎ বিরাট জগৎ। একান্ত নিজস্ব জগৎ। যার ভেতর রবীন্দ্রনাথ হরহামেশা ডুবে থাকতেন। ধ্যানে থাকতেন। তার সে ধ্যান কবিতার ভেতর দিয়ে এবং গানের শরীর বেয়ে জেগে উঠেছে।

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.