ছড়ার রাজ্যে রবীন্দ্রনাথ

ড. আশরাফ পিন্টু

বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এক বিস্ময়কর প্রতিভা। তার সৃষ্টিকর্মের প্রাচুর্যে ও বৈচিত্র্যতায় তিনি বাংলা সাহিত্যকে যেমন পরিপূর্ণতা দান করেছেন তেমনি তাকে বসিয়েছেন শ্রেষ্ঠত্বের আসনে। এই বহুমুখী প্রতিভাধর কবির ছড়াগুলো যখন পাঠ করা হয় তখন আরেক বিস্ময় ধরা পড়ে। এখানে তিনি কত সহজ-সরল। দীর্ঘদিনের যুক্তিশীলতার মন ও মানস এখানে নেই। নেই ধ্যানীজগতের কোনো কথা। রবীন্দ্র চরিত্রের এক ভিন্নতর বৈশিষ্ট্য ধরা পড়ে তার শিশুতোষ ছড়াগ্রন্থগুলোতে।
রবীন্দ্রনাথের শিশুতোষ ছড়াগ্রন্থ মূলত দু’টিÑ ‘খাপছাড়া’ ও ‘ছড়া’।
‘খাপছাড়া’ ছড়াগ্রন্থের শুরুটা করেছেন তিনি এভাবেÑ
সহজ কথা লিখতে আমায় কহ যে
সহজ কথা যায় না লেখা সহজে।
লেখার কথা মাথায় যদি জোটে
তখন আমি লিখতে পারি হয় তো,
কঠিন লেখা নয় কো কঠিন মোটে
যা-তা লেখা তেমন সহজ নয় তো।
রবীন্দ্র ভাষা, রবীন্দ্র চিন্তা-চেতনার এক বৈপরীত্য রূপই যেন ধরা পড়ে এখানে। শুরুতেই যেন গ্রন্থের বৈশিষ্ট্যের আভাস পাওয়া যায়। অগোছালো সহজকথাগুলো কি আসলেই গুছিয়ে লেখা সহজ? যেমন-
ভোলানাথ লিখেছিলো/তিন-চারে নব্বই /
গণিতের মার্কায়/কাটা গেল সর্বই। /
তিন-চারে বারো হয়/মাস্টার তারে কয়/
লিখেছিনু ঢের বেশি/এই তার গর্বই।
(৬৩ সংখ্যা ছড়া : খাপছাড়া)
এই শিশুমনস্তত্ব রবীন্দ্রনাথ উপলব্ধি করেছিলেন হৃদয় দিয়ে। বিশিষ্ট ফোকলোরবিদ ড. মহযারুল ইসলামের ভাষায়, ‘হৃদয়গত আত্মকথন’ যেখানে ‘পরাজিত ব্যাকরণ এবং পরাভূতযুক্তি’ সেখানে। তাই ‘রবীন্দ্রনাথ... প্রথা স্বীকৃত পথে এগোননি।’
ান্তবুড়ির দিদি শাশুড়ির
পাঁচ বোন থাকে কালনায়,
শাড়িগুলো তারা উনুনে বিছায়
হাঁড়িগুলো রাখে আলনায়।
কোনো দোষ পাছে ধরে নিন্দুকে
নিজে থাকে তারা লোহার সিন্দুকে
টাকা-কড়িগুলো হাওয়া খাবে বলে
রেখে দেয় খোলা জানলায়Ñ
নুন দিয়ে তারা সাঁচি পান সাজে
চুন দেয় তারা ডানলায়।
(১ সংখ্যক ছড়া: খাপছাড়া)
ছড়ার ভেতর যে কৌতুক, শ্লেষ থাকে তা শিশুমনস্তত্বের যেমন একটা বিশেষ দিক তেমনি এর অসংলগ্নতা অগোছালো কথাবার্তাও ছড়ার লৌকিক রঙ-রূপের এক অনন্য বৈশিষ্ট্য। প্রথম থেকেই লোকসাহিত্যের প্রতি রবীন্দ্রনাথের একটা বিশেষ দুর্বলতা ছিল, বিশেষ করে লোকছড়ার প্রতি তিনি বেশ আগ্রহী হয়ে উঠেছিলেন। এর প্রমাণ পাওয়া যায় তার ‘ ছেলে ভুলানো ছড়া’ ও ‘গ্রাম্যসাহিত্য’ প্রবন্ধে। তিনি অনেক লোকছড়া সংগ্রহও করেছিলেন। ‘ছেলে ভুলানো ছড়া’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘বাংলা ভাষায় ছেলে ভুলাইবার জন্য যে সকল মেয়েলি ছড়া প্রচলিত আছে, কিছুকাল হইতে আমি তাহা সংগ্রহ করিতে প্রবৃত্ত ছিলাম। আমাদের ভাষা ও সমাজের ইতিহাস নির্ণয়ের পে সেই ছড়াগুলির বিশেষ মূল্য থাকিতে পারে; কিন্তু তাহাদের মধ্যে যে একটি সহজ কাব্যরস আছে সেইটিই আমার নিকট অধিকতর আদরণীয় হইয়াছিল।’ আর এরই যেন প্রভাব পাই আমরা রবীন্দ্রনাথের রচিত ছড়াগুলোতে।
‘ছড়া’ গ্রন্থের ৬ সংখ্যক ছড়াটির আংশিক পাঠ নেয়া যাকÑ
দিন চলে যায় গুনগুনিয়ে ঘুমপাড়ানির ছড়া,
শান বাঁধানো ঘাটের ধারে নামছে কাঁখের ঘড়া।
আতা গাছে তোতা পাখি, ডালিম গাছে মৌ
হীরে দাদার মড়মড়ে থান, ঠাকুর দাদার বৌ।
পুকুর পাড়ে জলের ঢেউয়ে দুলছে ঝোপের কেয়া
পাটনি চালায় ভাঙা ঘাটে তালের ডোঙার খেয়া।
খোকা গেছে মোষ চরাতে, খেতে গেছে ভুলে
কোথায় গেল গমের রুটি শিকের পরে তুলে।
আমার ছড়া চলেছে আজ রূপকথাটা ঘেঁষে
কলম আমার বেরিয়ে এল বহুরূপীর বেশে।...
এখানে দেখা যাচ্ছে লৌকিক রঙ-রসের বহুবিধ ব্যবহার। এখানে লোকছড়ার মতো যেমন পরস্পরহীন ঘটনা বা অসমন্ধতা আছে তেমনি আছে বিভিন্ন লৌকিক শব্দের ব্যবহার (আতা গাছে তোতা পাখি...) সেই সাথে আছে লৌকিক সুর ও ছন্দ। লৌকিক ছন্দের চমৎকারিত্ব ফুটে উঠেছে নিচের ছড়াটিতেওÑ
গলদা চিংড়ি তিংড়ি মিংড়ি লম্বা দাঁড়ার করতাল
পাকড়াশিদের কাঁকড়া-ডোবায় মাকড়শাদের হরতাল।
পয়লা ভাদর পাগলা বাঁদর লেজখানা যায় ছিঁড়ে
পালতে মাদার, সেরেস্তাদার কুটছে নতুন চিঁড়ে।
কলেজপাড়ায় শেয়াল তাড়ায় অন্ধকলুর গিন্নি
ফটকে ছোঁড়া চটকিয়ে খায় সত্যপীরের শিন্নি।...
সিরাজগঞ্জে বিরাট মিটিং তুলো বের করা বালিশ
বংশু ফকির ভাঙা চৌকির পায়াতে লাগায় পালিশ।
(২ সংখ্যক ছড়া : ছড়া)

‘খাপছাড়া’র মতোই ‘ছড়া’ গ্রন্থের ছড়াগুলোতে অগোছালো আর অসামঞ্জস্যের বিচিত্র সমাবেশ আছে। এর ছড়াগুলোও লৌকিক ছন্দে লেখা। ‘ছড়ার ছবি’তে তারই একটা পরিণতি আছে। তবে ‘ছড়ার ছবি’ ‘ছেলেদের জন্য লেখা’ হলেও ভাবের দ্যোতনা আর ভাষার সৌকুমার্যে তা যেন বড়দের বিষয় হয়ে ওঠেÑ
অন্ধকারে সিন্ধু তীরে একলাটি ওই মেয়ে
আলোর নৌকা ভাসিয়ে দিলো আকাশ পানে চেয়ে।
মা যে তাহার স্বর্গে গেছে এই কথা সে জানে
ওই প্রদীপের খেয়া বেয়ে আসবে ঘরের পানে।
পৃথিবীতে অসংখ্য লোক, অগণ্যতার পথ
অজানা দেশ কত আছে অচেনা পর্বত।
তারই মধ্যে স্বর্গ থেকে ছোট্ট ঘরের কোণ
যায় কী দেখা যেথায় থাকে দুটিতে ভাইবোন।
(আকাশ প্রদীপ : ছড়ার ছবি)

লোকছড়ার অন্তর্নিহিতভাব তার সরল-সহজ ছন্দরীতি রবীন্দ্রনাথকে দারুণভাবে প্রভাবিত করেছিল। ‘বৃষ্টি পড়ে টাপুর-টুপুর নদেয় এল বান’Ñ এই লোকছড়াটি প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, ‘এই ছড়াটি বাল্যকালে আমার নিকট মোহমন্ত্রের মত ছিল এবং সেই মোহ আমি এখনো ভুলিতে পারি নাই।’ তিনি যে লোকছড়ার প্রভাব প্রকৃতই ভুলতে পারেননি তার প্রমাণ পাওয়া যায় ‘বৃষ্টি পড়ে টাপুর-টুপুর’, ‘সাত ভাই চম্পা’, ‘শিশু’ ‘শিশু ভোলানাথ’ প্রভৃতি কবিতায়। ‘বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর’ কবিতাটির কিয়দংশÑ
বাদলা হাওয়ায় মনে পড়ে ছেলে বেলার গান
বিষ্টি পড়ে টাপুর-টুপুর নদেয় এল বান।...
কবে বিষ্টি পড়েছিল বান এল সে কোথা
শিব ঠাকুরের বিয়ে হলো কবেকার সে কথা।
সেদিনও কি এমনিতর মেঘের ঘটাখানা
থেকে থেকে বাজ-বিজুলি দিচ্ছিল কি হানা। ...
কোন ছেলেরে ঘুম পাড়াতে কে গাহিল গান
বিষ্টি পড়ে টাপুর-টুপুর নদেয় এল বান।

রবীন্দ্রনাথের ছড়াগুলোতে তার ছড়া প্রতিভার একটা স্পষ্টরূপ ধরা পড়েছে। এ ছড়াগুলোতে পাওয়া যায় রবীন্দ্র মানসে শিশুর অবস্থানÑ কিভাবে তিনি অতি সহজেই শিশুর চিন্তারাজ্যে ঢুকে যান। শিশুর মনরাজ্যে যে লৌকিক সুর-ছন্দ খেলা করে তারও আঁচ করা যায় এ ছড়াগুলো পাঠ করলে। সুতরাং রবীন্দ্রনাথের ছড়ায় শিশু মনস্তত্বের বিভিন্ন দিক এবং লৌকিক রূপ-রসের বৈচিত্র্য দুটো দিকই সমানভাবে প্রতিভাত হয়ে উঠেছেÑ এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.