ঢাকা, মঙ্গলবার,৩১ মার্চ ২০২০

উপমহাদেশ

দিল্লিতে কবরকে মন্দিরকে বানানো হলো!

বিবিসি

০৬ মে ২০১৮,রবিবার, ১৮:১৫ | আপডেট: ০৬ মে ২০১৮,রবিবার, ১৮:২৭


প্রিন্ট
সমাধিটির ছবি, এখন যেমন তা (ইনসেটে)

সমাধিটির ছবি, এখন যেমন তা (ইনসেটে)

ভারতের রাজধানী দিল্লিতে তুঘলক শাসন আমলের একটি প্রাচীন 'মকবরা' বা সমাধি সৌধকে হিন্দু মন্দিরে পরিণত করে ফেলা হয়েছে, এই অভিযোগ ওঠার পর কর্তৃপক্ষ ঘটনার তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে।

দক্ষিণ দিল্লির অভিজাত এলাকা সফদরজং এনক্লেভের গা ঘেঁষেই শহুরে গ্রাম হুমায়ুনপুর - সেখানেই প্রায় সাত শ' বছরের পুরনো এ্ই ইমারত এবং এটি কার কবর তা অজানা ।

তবে ইতিহাসবিদরা একমত যে, চতুর্দশ শতকের তুঘলক বংশের শাসনের সময় রাজপরিবারের কোনো সদস্যের সমাধিসৌধ হিসেবে এটি গড়ে তোলা হয়েছিল, এবং এর গম্বুজবিশিষ্ট স্থাপত্যরীতি থেকেও তা স্পষ্ট।

কিন্তু সম্প্রতি স্থানীয় একটি পত্রিকায় রিপোর্টে বলা হয়, গত মাসে সেটিকে সাদা আর গেরুয়া রং করে একটি মন্দিরের চেহারা দেয়া হয়েছে এবং ভেতরে রাধাকৃষ্ণ ও শিবের মূর্তি স্থাপন করা হয়েছে।

এ খবর সামনে আসার পর দিল্লির উপমুখ্যমন্ত্রী মনীশ শিশোদিয়া দ্রুত এর তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন।

দিল্লির আম আদমি পার্টি সরকার বলছে, এলাকার সাম্প্রদায়িক পরিবেশ বিষিয়ে তুলতেই এ কাজ করা হয়েছে - আর দিল্লির অনেক ইতিহাসবিদেরও অভিমত : আধুনিক যুগে এ ধরনের জিনিস কিছুতেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

কিন্তু ওই এলাকার বাসিন্দারা অবশ্য দাবি করছেন যে তারা জন্মাবধি ইমারতটিকে মন্দির হিসেবেই দেখে এসেছেন।

দিল্লি সরকারের সন্দেহ, এলাকার শান্তি-সম্প্রীতি বিঘ্নিত করতেই এ কাজ করা হয়েছে। তবে এলাকার স্থানীয় বিজেপি কাউন্সিলর মোটেও এর সাথে একমত নন।

বিজেপি নেত্রী ও কাউন্সিলর রাধিকা ফোগত বলছিলেন, "আমি পাঁচ-ছবছর ধরে এই এলাকায় আছি আর আগাগোড়া এটিকে মন্দির হিসেবেই দেখে এসেছি। এখানে নিয়মিত প্রসাদ বিতরণ হয়, ভেতরে গাওয়া হয় কীর্তনও।"

"গত বছর ভোটে জেতার পর এখানে মাথা ঠুকেই আমরা বিজয়োৎসব পালন করেছিলাম। কাজেই আমার মতে এটা কখনওই সমাধিসৌধ ছিল না।"

মকবরাটির স্থাপত্যশৈলী বা মাথার ওপরের গম্বুজ দেখলে অবশ্য পরিষ্কার বোঝা যায় এটি তুঘলক বা লোদি আমলের পুরাকীর্তি - কোনও হিন্দু মন্দিরের সঙ্গে এর বিন্দুমাত্র মিল নেই। কিন্তু মন্দিরের পূজারী বা হুমায়ুনপুরের গ্রামবাসীরা সে কথা মানেন না।

পূজারী যেমন দাবি করছেন, তার পিতামহ-প্রপিতামহরাই বরাবর এখানে পুজো দিয়ে এসেছেন, আর এটা মন্দির কি না তা নিয়ে কোনও সন্দেহের কারণই নেই।

তিনি বলছিলেন, "আশেপাশে সবাইকে জিজ্ঞেস করলেও একই উত্তর মিলবে। আর তা ছাড়া মুসলিমরাও কখনও আপত্তি তোলেননি যে এখানে কেন পূজা হচ্ছে, এখানে কোনও ধর্মীয় বিবাদও হয়নি। মন্দিরের বাইরে বোর্ডে তো শিব ভোলা মন্দির, স্থাপিত ১৯৭১ - এই ফলকও আছে।"

৪৫ বছর বয়সী কিষেণ প্রতাপ সিং পাশ থেকে যোগ করেন, "হুমায়ুনপুর গ্রামের এই ভোলেবাবা মন্দির একটা সুপরিচিত ল্যান্ডমার্ক - জ্ঞান হওয়া অবধি আমি এটাই দেখে এসেছি। আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়াও কখনো তা নিয়ে আপত্তি তোলেনি - আর আমি একেবারে ছোটবেলা থেকেই এখানে শিবের মাথায় জল ঢেলে আসছি।"

তবে ভারতের নামী ইতিহাসবিদ ও দক্ষিণ দিল্লির বহু বছরের বাসিন্দা ড: মৃদুলা মুখার্জি বিবিসিকে বলছিলেন - ওটা যে একটা 'টুম্ব' বা সমাধিসৌধ ছিল তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই - আর এভাবে একটা স্থাপত্যের চরিত্র বদলে দেয়া হচ্ছে এ জিনিস তিনি কখনও দেখেননি।

তার কথায়, "আমি তো কখনও এরকম শুনিনি। সবাই জানে এটা একটা টুম্ব। এটা মসজিদ বা কোনও ধর্মীয় স্থাপনা ছির না ঠিকই, কিন্তু টুম্ব অবশ্যই ছিল - আর সেটাকেই পাল্টে এখন মন্দির বানানো হয়েছে।"

"দিল্লিতে বহু পরিত্যক্ত পুরাকীর্তি জবরদখল হয়েছে, মানুষ সেখানে থাকতে শুরু করেছে - এমন প্রচুর হয়েছে। কিন্তু সেটা মনুমেন্টগুলোকে উপেক্ষা করার গল্প, অন্য একটি প্রক্রিয়া। একটা মনুমেন্টের চরিত্রই তো এখানে বদলে দেওয়া হয়েছে - আর সেটা ইচ্ছাকৃতভাবে!" বলছিলেন ড: মুখার্জি।

কিন্তু এটাও তো ঠিক, ভারতের ইতিহাসে বহু মন্দিরকে মসজিদ বানানোর কিংবা তার উল্টোটা ঘটারও নজির আছে?

"প্রাচীন আমলে বা মধ্যযুগে নিশ্চয় হয়েছে - বহু ধর্মীয় স্থাপনা ধ্বংসও করা হয়েছে। সেই যুগের ধ্যানধারণায় হয়তো সেগুলো যেত - কিন্তু আধুনিক যুগে তো আর এ জিনিস হয় না, অন্তত হওয়া উচিত না!" জবাব দেন জেএনইউ-র সাবেক অধ্যাপক মৃদুলা মুখার্জি।

আসলে একুশ শতকের আধুনিক ভারতে একটি ঐতিহাসিক স্থাপত্যকে রাতারাতি শিবমন্দিরে বদলানো হতে পারে, এটা ভেবেই অনেকে বিস্মিত না-হয়ে পারছেন না।

কিন্তু দিল্লির হুমায়ুনপুর গ্রামের বাসিন্দারা বা তাদের মতো আরও অনেকেই এর মধ্যে মোটেই অস্বাভাবিক কিছু দেখছেন না!

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫