মালয়েশিয়ায় পটপরিবর্তন অনিবার্য?

অবলোকন
মাসুম খলিলী

মালয়েশিয়ায় জাতীয় নির্বাচনের দিন এগিয়ে আসার সাথে সাথে ‘অবিশ্বাস্য’ কিছু ঘটনা দেখা যাচ্ছে। নির্বাচনী প্রচারণা শুরুর প্রথম দিকে মালয়েশিয়ার নাগরিকদের প্রশ্নœ করা হলে স্বাভাবিক জবাব ছিল বিরোধী পক্ষ হয়তো বেশি ভোট পাবে, কিন্তু জয়লাভ করবেন ক্ষমতাসীনেরাই। প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজ্জাকের বারিসান ন্যাশনাল যেভাবেই হোক, জয়লাভ নিশ্চিত করবে। নির্বাচনী প্রচারণার মাঝামাঝি এসে ‘টক অব দ্য কান্ট্রি’ হয়ে উঠেছে মালয় সুনামির বিষয়টি। নির্বাচনের দুই দিন আগে রাজধানী কুয়ালালামপুরসহ বিভিন্ন রাজ্য থেকে সত্যিকার মালয় সুনামির খবর পাওয়া যাচ্ছে। বহুলালোচিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী ৯২ বছর বয়সী ড. মাহাথির মোহাম্মদ যেখানে যাচ্ছেন বিপুল জনসমাগম ঘটছে সেখানে। বিভিন্ন স্থানে মধ্যরাত পর্যন্ত হাজার হাজার মানুষ তার কথা শোনার জন্য অপেক্ষা করছে। বিরোধী জোটের লক্ষাধিক লোকের সমাবেশ ঘটছে মালয়ী-অমালয়ী নির্বিশেষে পশ্চিম মালয়েশিয়ার বেশির ভাগ রাজ্যে। অন্য দিকে, প্রধানমন্ত্রী নাজিব জনসমাবেশের চেয়ে বিভিন্ন প্রকল্প উদ্বোধনের মতো ছোটখাটো অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখছেন বেশি।

কতটা অটুট বারিসানের ভোট ভিত্তি?
ক্ষমতাসীন বারিসান ন্যাশনালের মূল শক্তি হলো গ্রামীণ মালয়ী জনগোষ্ঠী এবং বোর্নিও মালয়েশিয়ার সাবাহ-সারাওয়াকের জনগণ। গ্রামীণ মালয়েশিয়ার নির্বাচনী এলাকাগুলোতে ভোটার সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম। গ্রামের মানুষ প্রধানমন্ত্রী নাজিবের বিরুদ্ধে ওয়ান এমডিবি দুর্নীতির অভিযোগ দিয়ে খুব একটা প্রভাবিত হয়েছে বলে মনে হয় না। মাহাথির নিজেই ‘মালয়েশিয়াকিনি’র সাথে সাক্ষাৎকারে বিষয়টি স্বীকার করে নিয়ে বলেছেন, গ্রামের মানুষ ৪২ ‘বিলিয়ন’ রিংগিতকে মনে করে, ৪২ ‘মিলিয়ন’ রিংগিত। এমনকি কোনো কোনো সময় ৪২ রিংগিতের সাধারণ বিষয় বলেও মনে করে। তাদের এমনও ধারণা রয়েছে যে, প্রধানমন্ত্রী যিনিই হন তিনি দুর্নীতি করেন। কিন্তু তারা যে আগের তিন বেলা খাওয়ার পরিবর্তে এখন দুই বেলা খেতে বাধ্য হচ্ছে; আর আগে ছেলেরা বাইরে পড়তে সহজেই যে স্কলারশিপ পেত তা এখন পাচ্ছে না, সেটি ভালোভাবে বুঝতে পারে। জীবনযাত্রার মান, জিএসটিÑ এসব বিষয়ই এখন গ্রামের মানুষের কাছে তুলে ধরছে বিরোধী জোটের কর্মীরা। এতে বারিসানের পক্ষের জনমত যে ক্ষয় হচ্ছে, সেটিই ক্ষমতাসীন আমনোর বড় উদ্বেগের বিষয়।
সাবেক প্রভাবশালী মন্ত্রী দায়েম জজনুদ্দিন, আমিন রইস ও রাফিদা আজিজের মতো ‘স্টলওয়ার্ট’রা বারিসানের পক্ষ ছেড়ে বিরোধী পাকাতান হারাপানের প্রচারণায় অংশ নেয়ার বিরাট প্রভাব পড়েছে আমনো সমর্থকদের মধ্যে। আমিন রইস বলেছেন, আমনো বা বারিসানের সময় শেষ হয়ে গেছে। দায়েম জজনুদ্দিনও বারবার বলছেন, বারিসান এখন অতীত হতে চলেছে। এর সংস্কারের জন্য যখন যে উদ্যোগ নেয়ার প্রয়োজন ছিল তখন তাতে সাড়া দেয়া হয়নি।’ একজন তার অতীত ভবিষ্যদ্বাণীর কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, মাহাথির হবেন আমনোর শেষ প্রধানমন্ত্রী। অর্থাৎ তিনি আবার প্রধানমন্ত্রী হবেন এবং এরপর শুরু হবে নতুন অধ্যায়। আবার কেউ কেউ এটিও বিশ্বাস করেন; মাহাথির প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর আবার আমনোর মূল ধারাকে কাছে টেনে নেবেন।

তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়
এবার প্রাক-নির্বাচন সময়ের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলোÑ সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনী এবং পুলিশপ্রধানকে মাহাথির মোহাম্মদ নিজে চিঠি দিয়ে তাদের নিজ নিজ বাহিনীর সদস্যদের প্রভাবমুক্তভাবে ভোট দেয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন। বারিসানের নেতারা এই চিঠির তীব্র সমালোচনা করেছেন। কিন্তু এরপরও তিন বাহিনীর প্রধানরা এবং পুলিশপ্রধান সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে এসব বাহিনীর সদস্যদের তাদের নিজস্ব বিবেচনা অনুসারে ভোটাধিকার প্রয়োগ করার আহ্বান জানিয়েছেন। মালয়েশিয়ার স্বাধীনতা-উত্তর ইতিহাসে এটি এ ধরনের প্রথম ঘটনা। এ ছাড়া দেশটির কোনো কোনো সুলতানের বক্তব্যে স্থিতিশীলতা রক্ষার বক্তব্যের আড়ালে বারিসানের প্রতি পরোক্ষ মত ব্যক্ত হচ্ছিল। মাহাথির বলেছেন, জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে ভূমিকা পালন করা হলে তারা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও মাঠে নামতে পারেন। এ বক্তব্যের পর সুলতানদের পক্ষ থেকে এখন আর সেই ধরনের বক্তব্য আসছে না।

পটপরিবর্তনে গুরুত্ববহ
মালয়েশিয়ায় ক্ষমতার পটপরিবর্তনের জন্য তিনটি বিষয় অতি গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, মূল মালয়ী ধারায় গ্রহণযোগ্যতা। দ্বিতীয়ত, প্রভাবমুক্তভাবে জনগণের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারার বিষয় নিশ্চিত করা। তৃতীয়ত, নির্বাচনের ফলাফল অনুসারে নিয়মতান্ত্রিকভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের বিষয়টি নিশ্চিত করা। সারা দেশ থেকে যেসব তথ্য এখন কুয়ালালামপুরে আসছে, তাতে বিরোধী জোটের সমর্থন বাড়ছে। এমনকি অনেক স্থানে ‘মালয় সুনামি’ বলতে নির্বাচনে জাগরণের যে কথা বলা হচ্ছে, সেটিও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। নির্বাচনের আগে আসন পুনর্বিন্যাস থেকে শুরু করে বেশ কিছু কাজে নির্বাচন কমিশন ক্ষমতাসীন জোটের পক্ষে দৃশ্যমান ভূমিকা রেখেছে। বিরোধী দলের জনসমাবেশ নিয়ন্ত্রণ করার জন্য বিধিও জারি করেছে। প্রতীক বরাদ্দ দেয়ার ক্ষেত্রেও পক্ষপাত লক্ষ করা গেছে। কিন্তু ক্ষমতার ভরকেন্দ্রগুলো পরিবর্তনের আভাসকে গ্রহণ করে নেয়ার বার্তা স্পষ্ট হওয়ার পর থেকে মনে হচ্ছে, তারা দৃশ্যমান পক্ষপাতিত্বের রাস্তা থেকে কমিশন সরে এসেছে। সম্ভবত পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপপ্রধানমন্ত্রী আহমদ জায়েদ হামিদী সঙ্ঘাত এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছেন লোকজনকে। এ অবস্থায় মনে হচ্ছে, জনগণের ভোটাধিকার প্রয়োগ করার সুযোগ দেয়া হবে এবং বিরোধী জোট তাতে জয়ী হলে বড় ধরনের কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হবে না।

শাসকদের শঙ্কার কারণ
নির্বাচনের আগে দীর্ঘ সময় নিয়ে বারিসান ন্যাশনাল তার কৌশল বিন্যাস করেছে। এই কৌশলে ক্ষমতাসীনরা সরকারবিরোধী ভোট বিভাজনের ওপর বেশি ভরসা রেখেছে। এক সময়ের বিরোধী জোটের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য পাস-এর দুই-তৃতীয়াংশ আসনে প্রার্থী মনোনয়ন প্রদানকে গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হতে পারে বলে আশা করা হয়েছে। মালয়ী প্রধান অঞ্চলগুলোতে এ প্রভাব অনেক বেশি থাকার কথা যেখানে মাহাথিরের প্রভাবে সরকারি পক্ষের ভোট বিরোধী পক্ষে ঝুঁকে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কেলান্তান, তেরাঙ্গানু, কেদাহ, পারলিস ও পেরাকে পাস-এর সাংগঠনিক ক্ষমতা এবং মালয়ীদের মধ্যে প্রভাব রয়েছে। এসব অঞ্চলে পাস যত বেশি ভোট পাবে ততটাই বারিসানের জয়ের সম্ভাবনা উজ্জ্বল হওয়ার কথা। কিন্তু মারদেকা সেন্টারের জরিপ থেকে যে প্রবণতা দেখা গেছে, পাস এবং বারিসান দুই পক্ষ থেকেই বিরোধী জোটের দিকে সমর্থন ছুটে যেতে দেখা যাচ্ছে। এটি যত জোরালো হবে ততটা সম্ভাবনা বাড়বে বারিসানের বিপর্যয়ের।
এবার মালয়েশিয়ার দেড় কোটি ভোটারের মধ্যে ৪১ শতাংশেরই বয়স ৪০ বছরের নিচে। এক জরিপ অনুযায়ী, গ্র্যাজুয়েট মালয়েশিয়ানদের ৪০ শতাংশ এখন কর্মহীন। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ শতাংশ বিবেচনায় বর্তমানে সবচেয়ে কম। বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়েও অনেককে ড্রাইভারের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতে দেখা যায়। এ গ্রুপটি এবারের ভোটে অনেক বড় ভূমিকা পালন করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এর মধ্যে ক্ষমতাসীন বারিসানের জন্য একটি ইতিবাচক দিক হলোÑ বোর্নিও মালয়েশিয়ায় তাদের সমর্থনে জোট সহযোগীদের সুবাদে, উপদ্বীপ মালয়েশিয়ার মতো ততটা বিপর্যয় ঘটেনি। মুখ্যমন্ত্রীর শক্ত প্রভাব ও অবস্থানের কারণে সারনোওয়াকে মাত্র দু-তিনটির বেশি আসন বিরোধী জোট পাওয়ার সম্ভাবনা কম। সাবাহতে আমনোর সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট শফি আবদাল ওয়ারিসান সাবাহ নামে একটি আঞ্চলিক দল গঠন করে বারিসানকে চ্যালেঞ্জ করছেন। কিন্তু উপদ্বীপ মালয়েশিয়ার মতো সাড়া সেখানে পাওয়া যাচ্ছে বলে মনে হয় না।

ব্যতিক্রমী নির্বাচন
সার্বিকভাবে অতীতের যেকোনো নির্বাচনের তুলনায় মালয়েশিয়ার এবারের নির্বাচন অনেকখানি ব্যতিক্রমী। এবার মালয়ীদের মধ্যে এই নির্বাচন নিয়ে যে ধরনের সাড়া, তাতে মনে হয় সপ্তাহের মাঝামাঝি একটি দিনে ভোটের দিন নির্ধারণ করা হলেও আগের বারের মতো ৮০ শতাংশের বেশি ভোট পড়বে। নির্বাচনে জনপ্রবাহ যখন বেড়ে যায় তখন কারচুপি করাও কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে নাজিব বা তার জোট বারিসান জনমতের বাইরে গিয়ে জোর করে নির্বাচনে ‘জিতে যাবে’ বলে যে আশঙ্কা ব্যক্ত করা হচ্ছে, তার সম্ভাবনা কম। মালয়েশিয়ার বিভিন্ন সরকার ভোটের জন্য নগদ অর্থ অথবা অন্য সুবিধা দেয় কিন্তু তৃতীয় বিশ্বের অন্য অনেক দেশের মতো ফলাফল জালিয়াতি করার দৃষ্টান্ত এখানে নেই। সেই দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে চাইলেও টাকা ও ক্ষমতার জোরে নাজিব রাজ্জাক তা করতে পারবেন বলে মনে হয় না।
মালয়েশিয়ার স্বাধীন মতামত জরিপ প্রতিষ্ঠান ‘মারদেকা সেন্টার’ নির্বাচনের আগে আগে আরেকটি জরিপ প্রতিবেদন প্রকাশ করবে। এতে চূড়ান্ত একটি ধারণা পাওয়া যেতে পারেÑ কী হতে যাচ্ছে মালয়েশিয়ায়। মাহাথির-আনোয়ারের এককালের ভেঙেপড়া জুটিই কি আবার ক্ষমতায় যাবে, নাকি মাহাথির ‘নগদই রাজা’ বলে যার নাম দিয়েছেন, সেই নাজিব রাজ্জাক তার ক্ষমতার ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখবেন? হ
[email protected]

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.