ঢাকা, রবিবার,৩১ মে ২০২০

উপসম্পাদকীয়

মালয়েশিয়ায় মূল্যবোধ ও প্রত্যাশার বিজয়

আমিনুল ইসলাম শান্ত

১১ মে ২০১৮,শুক্রবার, ০০:০০


প্রিন্ট

একজন বিচক্ষণ রাজনীতিবিদ নিয়ে অনেকের যে শঙ্কা ছিল, তা মিথ্যা প্রমাণ করে রাজনৈতিক দূরদর্শিতার হালনাগাদ পরিচয় দিলেন ড. মাহাথির বিন মোহাম্মদ। নিঃসন্দেহে তার এ নির্বাচনী সিদ্ধান্তের পেছনে বুদ্ধিবৃত্তিক দর্শন, নির্ভুল হিসাব-নিকাশ পরিপূর্ণ ছিল।
ড. মাহাথিরের এ বিজয় মূলত দুর্নীতির বিরুদ্ধে জনমানুষের অবস্থান। এমনকি তার রাজনৈতিক জীবনে সুপার চ্যালেঞ্জে আসার কারণও ছিল একটিই। ড. মাহাথির নিজ হাতে গড়ে যাওয়া আধুনিক মালয়েশিয়াকে দুর্নীতি ও অর্থনৈতিক দুর্দশা থেকে মুক্ত করার জন্য দৃঢ় প্রত্যয়ী হন এবং অশীতিপর বয়সে যুব তারকার ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। তার এ বিজয় মূল্যবোধ ও নৈতিকতার বিজয়।
যুগে যুগে, দেশে দেশে যখন শাসকগোষ্ঠী দুর্নীতিপ্রবণ হয়েছে, শাসক যখন জনগণকে নিপীড়নের সামগ্রীতে পরিণত করেছে, ঠিক তখনই জনমনে জমে থাকা ধিক্কার ব্যালট পেপারে চিহ্নিত হয়েছে।
মালয়েশিয়া যে দুর্নীতির কবলে ছেয়ে গিয়েছিল, তা পদে পদে অনুধাবন করেছে সবচেয়ে বেশি দেশটিতে অবস্থানরত বিপুল সংখ্যক প্রবাসী এবং ব্যবসায়ী শ্রেণী। সদ্য পরাজিত প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাকের দুর্নীতির কারণে মালয়েশিয়ায় দেখা দেয় অর্থনৈতিক মন্দা। ডলারের বিপরীতে রিংগিতের দাম কমে যায় এবং পর্যটননির্ভর ও শিক্ষানির্ভর দেশটিতে অর্থনৈতিক দুরবস্থা দেখা যায়। অনেক বহুজাতিক কোম্পানি বিশেষ করে ঋণিজ দ্রব্য আহরণকারী কোম্পানি ও নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায় বন্ধ হয়ে যায়। ফলে শ্রমবাজারে দেখা যায় বিশৃঙ্খলা। বিদেশ থেকে শ্রমিক আসা বন্ধ থাকায় অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়ে। সরকার এ অবস্থা থেকে মুক্তির জন্য ২০১৪ সালে প্রণীত ২০১৪-১৫ অর্থবছরের বাজেটে যোগ করে অতিরিক্ত ট্যাক্স। নাজিব রাজাক ৬ শতাংশ জিএসটি যোগ করলে পণ্য ও সেবার দাম বেড়ে যায়, যা কার্যকর শুরু হয় এপ্রিল ২০১৫ সালে। ফলে জনজীবনে দাম বেড়ে অস্বস্তি দেখা যায়। যার প্রভাব পড়ে পর্যটন ব্যবসায়ও। প্রতি বছর দেশটিতে গড়ে ২ কোটি ৭০ লাখ পর্যটক আসেন, ভ্রমণ করেন এবং কেনাকাটা করে থাকেন। কিন্তু জিএসটির প্রভাবে বাজার ভারসাম্য হারালে বিদেশীদের জন্য ক্রয় দলিল প্রদর্শনসাপেক্ষে এয়ারপোর্টে জিএসটি রিটার্নের একটি ব্যবস্থা করা হয়। তবু নাজিব ফেরাতে পারেননি অর্থনীতিকে। কারণ, জিএসটির প্রভাবে সার্বিক ক্ষেত্রে যেমন জ্বালানি তেলের দাম, গণপরিবহনে ভাড়া, মেট্রোরেলে ভাড়া, সড়ক ও জনপদে অতিরিক্ত টোলের বোঝা বেড়ে প্রভৃতি খাতে জনরোষ বাড়তে থাকে।
চমৎকার ব্যাপার হলো, নাজিব রাজাক তার অবশ্যম্ভাবী পতনের কারণ নিজেও অনুভব করেছিলেন আগেই। তাই নির্বাচনের আগের দিন সন্ধ্যায় এক ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, ‘তার দল জয়ী হলে ২৬ বছর পর্যন্ত বয়সীদের জন্য কোনো আয়কর থাকবে না, সপ্তাহে দুই দিন সরকারি ছুটি দেবেন এবং ঈদ উৎসবের সময় পাঁচ দিন কোনো রোড টোল প্রয়োজন হবে না।’
তার এ ঘোষণা তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করার জন্য। জাতীয় নির্বাচনের আগের দিনে নাজিব যে আশ্বাস দিয়েছিলেন, এটা মূলত তার ভুলের আত্মস্বীকৃতি।
বিভিন্ন কারণে মালয়েশিয়া ভূখণ্ডের বিস্তীর্ণ অঞ্চল ও রাজ্য ভ্রমণের সুযোগ হয়েছে আমার। ভূমিপুত্র মালয় মুসলিম, ইন্দোনেশিয়া বংশোদ্ভূত মালয়, ইন্ডিয়ান ও চীনা অধিবাসীদের সাথে কথোপকথনের নিরিখে সামাজিক বিশ্লেষণে আমি বলব, ভূমিপুত্র মালয়রা, বিশেষ করে শিক্ষিতরা নম্র-ভদ্র, শান্ত প্রকৃতির এবং জাতিগতভাবে অল্পে তুষ্ট। এই অল্পে তুষ্টিও ধারাবাহিক করতে পারেননি নাজিব।
ড. মাহাথির আনোয়ার ইব্রাহিমের সাথে জোট করায় এবং বলতে গেলে আনোয়ার ইব্রাহিমের ওই দলটিকেই প্রতিনিধিত্ব করায় জনমনে শঙ্কা হয়েছিল মাহাথির তার ব্যক্তিত্ব হারান কি না! এখন এটুকু স্পষ্ট, জয়টা হয়েছে মূলত মূল্যবোধের। ব্যক্তি ও দল বড় নয়।
নাজিব রাজ্জাক তার নিজের দুর্নীতিকে অপপ্রচার বলে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছিলেন। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম একে অপপ্রচার বলে একটি মিশ্র অবস্থান সৃষ্টি করলেও মাহাথির নিজ হাতে গড়া দেশে শতভাগ নিশ্চিত হতে পেরেছিলেন যে, নাজিব দুর্নীতি করেছে। তাই তিনি এ বয়সে নাজিবের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন।
নাজিবের দুর্নীতির যে ওয়ান এমডিবি প্রকল্পের কথা বলা হয় সেটি মূলত গঠিত হয়েছিল ২০১০ সালে এবং এটি হলো ‘এক মালেশিয়া’ বা মালয় ভাষায় ‘ছাতু মালেশিয়া ’ প্রকল্পের একটি অংশ। জাতিগত নৃতাত্ত্বিক বিবেচনায় মন্ত্রিপরিষদ, সরকারি সংস্থা, সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে সমতা আনা, জাতীয় ঐক্য স্থাপন এবং সরকারের দক্ষতা আনয়নকল্পে প্রধানমন্ত্রী নাজিব পরিকল্পিত ‘ছাতু মালয়েশিয়া’ প্রকল্পে আছে সাতু মালয়েশিয়া কিনিক, সাতু মালয়েশিয়া কমিউনিটি ওয়াইফাই, সাতু মালয়েশিয়া ই-মেইল, সাতু মালয়েশিয়া ডেভেলপমেন্ট বেরহাড ও কেদাই রাকায়াত সাতু মালয়েশিয়া প্রভৃতি।
সাতু মালয়েশিয়া ডেভেলপমেন্ট বেরহাডের ৭০০ মিলিয়ন ডলার নিজ অ্যাকাউন্টে স্থানান্তরের অভিযোগে দেশে-বিদেশে সমালোচনার মুখে পড়েন নাজিব রাজাক।
উল্লেখ্য, ২০১০ সালে ২২ এপ্রিল আনোয়ার ইব্রাহিমকে পার্লামেন্ট থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল কারণ তিনি ৩০ মার্চ পার্লামেন্ট প্রেস কনফারেন্স করে বলেছিলেন, সাতু মালয়েশিয়ার সাথে ইসরাইলের কানেকশন আছে এবং এপকো নামক কোম্পানিও সংশ্লিষ্ট।
আমি পাঁচ বছর ধরে নাজিব রাজাক ও আনোয়ার ইব্রাহিমের ফেসবুক স্ট্যাটাস ফলো করি। নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছিল, সামাজিক মাধ্যম প্রমাণ করেছিল মাহাথিরের বিজয় সুনিশ্চিত। নির্বাচনের দিন পরিপূর্ণ ফলাফল ঘোষণার আগেই রাতে স্থানীয় সময় ১১টার দিকে মাহাথির দাবি করেন, নির্বাচন কমিশন ফল ঘোষণা করতে দেরি করছে এবং তিনি ও তার জোট পুত্রজায়া জয় করেছেন।
মাহাথির বিন মোহাম্মদ চৌকস, বিচক্ষণ ও একজন প্রতিভাবান বিশ্বরাজনীতিবিদ। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অশান্ত রাজনীতি আর বিশ্বরাজনীতিতে অসামান্য অবদান রাখার সুযোগ আছে তার এবং আনোয়ার ইব্রাহিমের।হ
লেখক : গণমাধ্যমকর্মী

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫