ঢাকা, মঙ্গলবার,০২ জুন ২০২০

উপসম্পাদকীয়

নোবেল মুঠোফোন ও ছাত্রছাত্রী

খালিদ ফেরদৌস

১২ মে ২০১৮,শনিবার, ০০:০০


প্রিন্ট

ক্ষুদ্র ঋণ ও সামাজিক ব্যবসায় ধারণা দিয়ে সারা বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। তার এই ধারণা, এখন বিশ্বের শুধু অনুন্নত, স্বল্পোন্নত, উন্নয়নশীল দেশেই বাস্তবায়িত হচ্ছে না; এটি ইউরোপ-আমেরিকার অনেক উন্নত দেশেও অনুসরণ করা হচ্ছে। গ্রামীণ ব্যাংকের এই বিখ্যাত প্রতিষ্ঠাতা ঘোষণা দিলেন, আমি গ্রামীণ মানুষ বিশেষ করে মহিলাদের হাতে হাতে এমন জিনিস তুলে দেবো, যা দিয়ে তারা দেশে-বিদেশে অল্প খরচে কথা বলতে পারবে। আয় করে দারিদ্র্য নামক অনভিপ্রেত অবস্থা থেকে বের হয়ে স্বাবলম্বী জীবনযাপন করতে পারবে। তার কথা শুনে মানুষ হাসলেন এবং অনেকে ঠাট্টাও করলেন। তিনি জবাবে কোনো কথা বললেন না, কাজের কাজ করতে থাকলেন নীরবে। তিনি নরওয়ের মোবাইল অপারেটর প্রতিষ্ঠান টেলিনরকে এ দেশে আমন্ত্রণ জানিয়ে গ্রামীণফোনের যাত্রা শুরু করলেন। বাকিটা ইতিহাস। এখন রিকশাচালক থেকে শুরু করে মন্ত্রী-সচিব পর্যন্ত সবার হাতে হাতে মোবাইল বা মুঠোফোন। যারা স্বপ্নচারী, ভিশনারি তাদের কথা ও কাজ এমনই হয়।
দারিদ্র্যবিমোচন এবং নারীর ক্ষমতায়ন ও প্রাপ্য মর্যাদায় আসীন করাসহ সার্বিকভাবে সমাজের উন্নয়ন-অগ্রগতি এবং কল্যাণে অসামান্য অবদানের মাধ্যমে জন্য ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে নোবেল কমিটি ২০০৬ সালে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করে। তিনি বাংলাদেশের প্রথম এবং একমাত্র ব্যক্তি যিনি পৃথিবীর সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন।
এখন মুঠোফোন বা মোবাইল দিয়ে চাল-ডাল, রসুন- পেঁয়াজ কেনাকাটা থেকে শুরু করে বিদ্যুৎবিল পরিশোধ করা যায়। বিশেষ করে যোগাযোগ ও ব্যাংকিং খাতে আমূল পরিবর্তন এনে দিয়েছে এটি। কিছু দিন আগেও একটি কাজ করতে যেখানে সাত থেকে এক মাস লাগত; সেই কাজ এখন মুহূর্তে হয়ে যায় মোবাইল দিয়ে।
একই সাথে, মোবাইলের অপব্যবহার করে নানা ধরনের অপকর্ম ও অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। তবে এ জন্য মোবাইল নামক অতি মূল্যবান ইলেকট্রিক যন্ত্রকে দোষ দেয়ার কোনো যুক্তি নেই। এর জন্য একান্তভাবে আমরা নিজেরাই দায়ী। এখন একটু খতিয়ে দেখা যায়, মোবাইল কোমলমতি ছাত্রছাত্রীদের জন্য প্রয়োজনীয় কতটা। বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় এটা শিক্ষার্থীদের খুব একটা প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। প্রয়োজনীয় হতো যদি তারা এটি শিক্ষণীয় কাজে ব্যবহার করত। এখনকার বেশির ভাগ ছাত্রছাত্রী মা-বাবা বা অভিভাবকদের ফাঁকি দিয়ে খারাপ উদ্দেশ্যে এটা ব্যবহার করে।
অথচ মোবাইলের এক ‘ক্লিকে’ গুগল থেকে জানা যায়Ñ নাসা কবে মহাকাশযান মঙ্গলে প্রেরণ করবে, উসাইন বোল্ট যে গতিতে ট্র্যাকে দৌড়ান সেই গতি ৩৫৬ দিন দৌড়ালে চাঁদে পৌঁছে যাবেন, কবে বাংলাদেশ ইতিহাসে প্রথমবারের মতো মহাশূন্যে বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করবে ইত্যাদি। কিন্তু ছাত্রছাত্রীরা মোবাইলে ফেসবুক, চ্যাট, পর্নোগ্রাফি নিয়ে মহাব্যস্ত। না ঘুমিয়ে সারা রাত এসব কাজে ব্যস্ত থেকে দিনের বেলায় ক্লাসে গিয়ে ঝিমায়।
প্রত্যক ক্রিয়ার যেমন প্রতিক্রিয়া আছে, ভালোর বিপরীতে যেমন খারাপ আছে, ঠিক তেমনি সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমেরও নেতিবাচক দিক রয়েছে। যুক্তরাজ্যের চক্ষু বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়েছেন, মুঠোফোনের অতিরিক্ত ব্যবহারে দৃষ্টিবৈকল্য সৃষ্টি হতে পারে। তাই অভিভাবকদের উচিত, সন্তানদের লাগামহীন মোবাইল ব্যবহারের সুযোগ না দেয়া। তাছাড়া, তাদের নৈতিক উৎকর্ষ সাধনে সচেষ্ট হওয়া প্রয়োজন অভিভাবকদের। কারণ মোবাইল ও ইন্টারনেটের অপব্যবহারের কারণে ফেসবুকসহ ‘সামাজিক’ মিডিয়াগুলো সামাজিক বন্ধনকে শিথিল করে অসামাজিক বানিয়ে দিচ্ছে। প্রথম দিন ফেসবুকে পরিচয়, দ্বিতীয় দিন মন বিনিময়, তৃতীয় দিন দেখা, পঞ্চম দিন ব্রেক-আপ। মোবাইলের অপব্যবহারের কারণে তরুণ প্রজন্ম সব সময় দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগে। পড়ালেখায় মনোনিবেশ করতে পারে না, মনোযোগ দিয়ে ভাবতে পারে না ভবিষ্যতে সে কী করবে।
২০০১-০২ সালে এসএসসি ও ২০০৩-০৪ তে এইচএসসি ব্যাচ-পরবর্তী ছাত্রছাত্রীদের মাঝে মনোসংযোগ ও লেখাপড়ায় ভাটার টান। এর পরবর্তী সময়ে পরীক্ষার ফলে ‘এ’ প্লাস বেড়েছে বহুগুণ; কিন্তু বেড়েছে কি শিক্ষার মান ও ছাত্রছাত্রীদের মেধা ও মননের উৎকর্ষ? দুঃখজনক হলেও সত্য, বাড়েনি। এখনকার ছাত্রছাত্রীরা ‘ও ধস এচঅ ৫’; এ কে ফজলুল হক অ্যারিস্টটলের সাথে পরামর্শ করে লাহোর প্রস্তাব পেশ করেছিলেন; এমন হাস্যকর ধারণার প্রবর্তনকারী প্রজন্ম। তবে সবাইকে এই অপবাদে শামিল করা বোকামি। কারণ এখনকার প্রজন্ম থেকেও বের হচ্ছে ‘নাসা’র বিজ্ঞানী বা বিশ্ব অলিম্পিয়াডে দারুণ রেজাল্ট করা সব ছেলেমেয়ে। আর যারা অধঃপাতে যাচ্ছে তাদের এমন পরিণামের পেছনে নানাবিধ কারণ থাকতে পারে। এর অন্যতম প্রধান কারণ, ছাত্রছাত্রীদের হাতে স্মার্টফোন তুলে দেয়া। মোবাইল তাদের মনোসংযোগকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এতে ঠিক মতো তারা লেখাপড়ায় মনোনিবেশ করতে পারছে না এবং তারা বিভ্রান্ত হচ্ছে নানাভাবে। ২০০৩ সালের পূর্ববর্তী ছাত্রছাত্রীরা মোবাইল প্রায় ব্যবহার করত না বললেই চলে। তাই বলে কি তাদের লেখাপড়ায় মানের কমতি অথবা নিরাপত্তায় কোনো ঘাটতি পড়েছে? পড়েনি, বরং তাদের অবস্থা তুলনামূলকভাবে ভালো ছিল। তাহলে এখন আধুনিক যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলা, ইন্টারনেটভিত্তিক শিক্ষা অন্বেষণ কিংবা নিরাপত্তার ছুতো তুলে তাদের হাতে অভিভাবকরা মোবাইল তুলে দিচ্ছেন। কিন্তু বর্তমান ছাত্রছাত্রীদের আতশি কাচের নিচে আনলে যে বিষয়টা খুব পরিষ্কার তাহলোÑ মেধাবী ও সৃজনশীল প্রজন্ম গড়ে তুলতে অন্তত এইচএসসি পর্যন্ত মোবাইল ব্যবহারে সতর্কতা অবলম্বন এবং সরকারিভাবে উদ্যোগ নিয়ে স্কুল-কলেজ চলাকালে এর ব্যবহার নিষিদ্ধ করা উচিত। ছাত্রছাত্রীদের ক্ষেত্রে যোগাযোগ ও নিরাপত্তার বিষয় যদি বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয় তবে স্মার্টফোনের বদলে সাধারণ ফোন ব্যবহার করতে দেয়া যেতে পারে। তা হলে ছাত্রছাত্রীরা লেখাপড়ায় বেশি বেশি মনোযোগ দিতে পারবে। মননশীল মানুষ ও সমৃদ্ধ জাতি গঠনে এটি সময়ের দাবি।
লেখক : এমফিল গবেষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫