ঢাকা, বুধবার,০৩ জুন ২০২০

উপসম্পাদকীয়

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি

আত্মপক্ষ

এবনে গোলাম সামাদ

১২ মে ২০১৮,শনিবার, ০০:০০


প্রিন্ট

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্ব রাজনীতির ধারা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। একটি ধারার নেতৃত্ব দিচ্ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আর অন্য ধারার নেতৃত্ব দিচ্ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন। বলা হচ্ছিল, পৃথিবীর রাজনীতি দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। এক ভাগে হলো ধনতন্ত্র, আর এক ভাগে হলো সমাজতন্ত্র। পৃথিবীর রাজনীতিতে দু’টি আদর্শবাদ কাজ করছে। একটি হচ্ছে ধনতন্ত্র আর একটি হচ্ছে সমাজতন্ত্র; কিন্তু এখন এই আদর্শিক বিভাজন আর নেই।
সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়েছে। কেউ আর এখন বলছে না, বিশ্বজুড়ে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি স্থাপনের কথা। সবাই চাচ্ছে বাজার অর্থনীতি; যার ভিত্তি হলো পণ্য উৎপাদনের খরচ ও তা বিক্রয় করে লাভবান হওয়া। কিন্তু বিশ্ব এখন ধনতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রে বিভক্ত হয়ে না থাকলেও বিভক্ত হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ান ফেডারেশনের নেতৃত্বে। চীন একপর্যায়ে সোভিয়েত ইউনিয়নকে বলেছিল সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ। সে হাত মিলিয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে; কিন্তু বর্তমানে সে ঝুঁকে পড়তে চাচ্ছে রাশিয়ান ফেডারেশনের দিকে অর্থাৎ বিশ্ব রাজনীতি আবার হয়ে উঠতে চাচ্ছে অনেক ভিন্নভাবে দুই মেরুর রাজনীতি। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মতো দেশকে পররাষ্ট্র নীতিনির্ধারণের সময় দিতে হবে এই দুই মেরুর রাজনীতিকে বিশেষ বিবেচনা।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চিরদিনই বলে এসেছে, এটি একটি গণতান্ত্রিক ইউনিয়ন। সে আইন করেছে কোনো ব্যক্তি আট বছরের বেশি মার্কিন প্রেসিডেন্ট হতে পারবে না। কিন্তু রাশিয়ায় এ ধরনের কোনো আইন নেই। এ দিক থেকে বিচার করলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে বলতে হবে একটি উন্নত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা। বাংলাদেশ যদি চায় প্রকৃত গণতন্ত্র, তবে তাকে স্থাপন করতে হবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে অধিক নৈকট্য। কেননা তাহলে তার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পেতে পারবে অনেক মজবুত বুনিয়াদ।
বাংলাদেশ ইংরেজি ভাষাভাষীর দেশ নয়। কিন্তু সে ইংরেজি ভাষা জানা দেশ। ইংরেজি ভাষার মাধ্যমে সে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে যত সহজে বিভিন্ন বিষয়ে কৃতকৌশল গ্রহণ করতে পারবে, রুশ বা চীনা ভাষা থেকে সেটি সম্ভব নয়। তাই এ দিক থেকেও সে যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে নৈকট্য অর্জন করে, তবে হতে পারবে লাভবান। কৃতকৌশলের হস্তান্তরের (Transfer of Technology) মাধ্যমে বাংলাদেশকে লাভ করতে হবে অর্থনৈতিক অগ্রগতি। বাড়াতে হবে তার অর্থনীতির উৎপাদিকা শক্তি।
বর্তমান বিশ্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আছে খাদ্য উৎপাদনে সবচেয়ে এগিয়ে। সে যদি ইচ্ছা করে তবে প্রয়োজনে বাংলাদেশকে দিতে পারে খাদ্য সাহায্য। যেমন সে দিয়েছিল ১৯৭৪ সালে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র খাদ্য সাহায্য না দিলে ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষে যে আরো মানুষ অনাহারে মৃত্যুর মুখে পতিত হতো, সে বিষয়ে কোনো বিতর্কের অবকাশ নেই। বাংলাদেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে খাদ্য সাহায্য চেয়েছিল এবং পেয়েছিল। রাশিয়া সামরিক দিক থেকে একটি অগ্রসর দেশ; কিন্তু খাদ্য উৎপাদনে সে আছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে অনেক পিছিয়ে। সোভিয়েত ইউনিয়নে ইউক্রেনে হতো সবচেয়ে বেশি গম। কিন্তু সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন এখন ভেঙে পড়েছে। কেবল ভেঙেই পড়েনি, ইউক্রেন ও রাশিয়া হয়ে উঠেছে পরস্পরের শত্রু। দুই দু’টি বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির পরাজয়ের একটা বড় কারণ হলো খাদ্যাভাব। রাশিয়ায় হতে পারে অনুরূপ খাদ্যাভাব। যেটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ঘটতে পারবে না।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন হুমকি দিচ্ছেন, তার হাতে এমন মারণাস্ত্র আছে, যার সাহায্যে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ধ্বংস করতে পারেন। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সমর বিজ্ঞানে রাশিয়ার চেয়ে পিছিয়ে আছে, এমন ভাবা যায় না। ক’দিন আগে আমাদের দেশের অনেক পত্রপত্রিকার খবর পড়ে মনে হয়েছিল, উত্তর কোরিয়া পরমাণু বোমা ফেলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ধ্বংস করে দেবে। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, উত্তর কোরিয়ার পক্ষে সেটি ছিল অসম্ভব। তাই সে এখন আলোচনার টেবিলে বসছে দক্ষিণ কোরিয়ার সাথে। যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে আমাদের দেশের পত্রপত্রিকায় প্রমাণ করার চেষ্টা হচ্ছিল একজন উন্মাদ ব্যক্তি হিসাবে; তাকে নাকি এখন বিবেচনা করা হচ্ছে শান্তির জন্য নোবেল পুরস্কার দেয়ার। হঠাৎ করেই এখন বিশ্বের দৃষ্টিতে ট্রাম্প আর যেন থাকছেন না একজন রাজনৈতিক উন্মাদ। প্রতিভাত হচ্ছেন একজন রাজনৈতিক প্রজ্ঞাসম্পন্ন ব্যক্তি হিসেবে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে রোহিঙ্গারা হয়ে উঠেছেন একটা বিশেষ সমস্যা। ট্রাম্প বলছেন তিনি রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে মিয়ানমারের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে রাজি। চীন ও রাশিয়ার নেতারা নিয়েছেন মিয়ানমারের পক্ষ। এ ক্ষেত্রে বাস্তব পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশকে শেষ পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দিকে সরে যাওয়া ছাড়া উপায় থাকবে না। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি নির্ভর করবে বিশ্ব রাজনীতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সঙ্গে রাশিয়া ও চীনের মধ্যে সঙ্ঘাতের ওপর। নির্ভর করবে চীন ও রাশিয়া বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কী নীতি গ্রহণ করবে, তারও ওপর।
ভারত এখন হয়ে উঠেছে একটা বিশ্ব শক্তি। সে কী নীতি গ্রহণ করবে বিশ্ব রাজনীতির ক্ষেত্রে, ভারত ঘেরা বাংলাদেশের পররাষ্ট্র নীতিনির্ধারণে সেটিও পাবে একটা বড় বিবেচনা। ভারত মিয়ানমারকে চটাতে চাচ্ছে না। কিন্তু ভারত একই সঙ্গে মিয়ানমার ও বাংলাদেশের স্বার্থ সংরক্ষণে কোনো ভূমিকা পালন করতে পারবে বলে মনে করার কারণ নেই। কেননা রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান করতে গেলে তাদের ফিরতে দিতে হবে আরাকানে এবং দিতে হবে মিয়ানমারের নাগরিকত্ব। তা না হলে এ সমস্যার কোনো স্থায়ী সমাধান আসতে পারবে না।
শান্তিপূর্ণ উপায়ে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান আদৌ সম্ভব কি না, তা নিয়েও সৃষ্টি হতে পারছে বিশেষ সংশয়। কেননা মিয়ানমারের সেনাপ্রধান মিন অং হলাইং বলছেন, বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের বাস করতে হবে সংরক্ষিত এলাকায়। কিন্তু বাংলাদেশ এ প্রস্তাবে রাজি হতে পারে না। কারণ, যেকোনো সময়ে রোহিঙ্গারা আবার হতে পারেন বহিষ্কৃত। কেননা তারা পাচ্ছেন না মিয়ানমারের নাগরিক অধিকার। বাংলাদেশ কি সামরিক দিক থেকে এতই দুর্বল যে, তাদের মেনে চলতে হবে মিয়ানমারের সেনাপতির নির্দেশ? মিয়ানমারের সেনাপতির বক্তব্য এবং বক্তব্য দেয়ার ধরন বাংলাদেশের জন্য সম্মানজনক নয়। লোক পরস্পর শোনা যাচ্ছে যে, আরাকানে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী মাটির নিচে গড়ছে বিশেষ ধরনের সেনা-শিবির। মাটির ওপরে বোমা ফেলে তাদের কোনো ক্ষতি করা যাবে না। অন্য দিকে তারা সুড়ঙ্গ কেটে চলে আসতে সক্ষম বাংলাদেশের সীমানার মধ্যেও। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের থাকা প্রয়োজন পাল্টা সমর প্রস্তুতি। এর অর্থ এই নয় যে, মিয়ানমারের সাথে বাংলাদেশের যুদ্ধ অনিবার্য। কিন্তু যুদ্ধের প্রস্তুতি ছাড়া শান্তির প্রত্যাশা হতে পারে খুবই বিপজ্জনক। আরাকান থেকে এরই মধ্যে ১১ লাখ রোহিঙ্গা এসে আশ্রয় নিয়েছেন টেকনাফ ও উখিয়ায়। যেকোনো পরিমাপে একটি দেশ যদি আর একটি দেশের মধ্যে এই পরিমাণ জনসংখ্যাকে ঠেলে দেয়, তবে সেটি বিবেচিত হতে পারে যুদ্ধ ঘোষণা হিসেবে।
জাতিসঙ্ঘ (UNO) গঠিত হয়েছিল বিশ্বশান্তি সংরক্ষণের জন্য; কিন্তু বৃহৎ শক্তির ভেটো দেয়ার ক্ষমতা তাকে করে তুলেছে একটা অকার্যকর প্রতিষ্ঠানে। বিশ্বের বেশির ভাগ রাষ্ট্র যদি বলে রোহিঙ্গাদের আরাকানে ফিরিয়ে নিতে হবে এবং তাদের দিতে হবে মিয়ানমারের নাগরিকত্ব; তবে রাশিয়া ও চীন ভেটো দিয়ে তা দিতে পারে খুব সহজেই বাতিল করে। বিশ্ব জনমতের কোনো গুরুত্ব থাকবে না সে ক্ষেত্রে। কয়েক বছর আগে বাংলাদেশের তখনকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি হেগের আন্তর্জাতিক বিচারালয়ে মামলা করে জিতেছিলেন। আন্তর্জাতিক আদালত মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মধ্যে সমুদ্রসীমা নির্দিষ্ট করে দিয়েছিলেন। কিন্তু মিয়ানমার এই সমুদ্রসীমা লঙ্ঘন করে বাংলাদেশের জেলে নৌকার ওপর বর্ষণ করছে গুলি। অর্থাৎ সে মনে করছে যে, বাংলাদেশের চেয়ে তার সামরিক শক্তি এখন বহু গুণে বেশি। তাই কেবল আলোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে যে সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে, তা কেবল আলোচনার মাধ্যমে সমাধান হতে পারবে বলে অনেকেরই মনে হচ্ছে না। শক্তির যুক্তিকে উত্তর দিতে হবে শক্তির মাধ্যমেই। মানবতার যুক্তি তুলে কোনো লাভ হবে বলে মনে হচ্ছে না। বাংলাদেশের সৈন্যরা জাতিসঙ্ঘের শান্তিরক্ষী বাহিনীর অংশ হয়ে বিভিন্ন দেশে যাচ্ছেন শান্তি রক্ষা করতে; কিন্তু এখন বাংলাদেশের সীমান্ত হয়ে উঠতে চাচ্ছে যেন অরক্ষিত। আমরা বিশ্বশান্তি নিয়ে যতটা উদ্বিগ্ন, নিজ দেশের সীমান্তের নিরাপত্তা নিয়ে যেন ততটা নই। যাকে আমরা বাংলাদেশের সাধারণ নাগরিক বাঞ্ছিত বলে দেশের স্বার্থেই ভাবতে পারছি না। যেখানে মিয়ানমারের জনবসতির ঘনত্ব প্রতি বর্গকিলোমিটারে মাত্র ২১ জনের কাছাকাছি, সেখানে বাংলাদেশের জনবসতির ঘনত্ব প্রতি বর্গকিলোমিটারে ৭৯৭ জনের কাছাকাছি। অর্থাৎ মিয়ানমারের চেয়ে বাংলাদেশে লড়াই করার মতো জনশক্তি আছে বহু গুণে বেশি। বাংলাদেশ ও আরাকানের মধ্যে কোনো পর্বতমালা নেই। বাংলাদেশ থেকে হেঁটেই যাওয়া সম্ভব আরাকানে। কিন্তু আরাকান ও মিয়ানমারের মূল ভূখণ্ডের মধ্যে আছে সুউচ্চ পর্বতমালা, আরাকান-ওমা। তার মধ্য দিয়ে গিরিপথ আছে। কিন্তু এই গিরিপথের মধ্য দিয়ে মিয়ানমারের মূল ভূখণ্ড থেকে আরাকানে আসতে এখনো যথেষ্ট অসুবিধা হয়। ১৯৪২ সালে জাপান ইয়াঙ্গুন (রেঙ্গুন) থেকে স্পিডবোটে এসে আরাকান জয় করেছিল, হাঁটা পথে নয়। এ যুদ্ধের ইতিহাস থেকে আমরা কিছুটা শিক্ষা নিতে পারি।
মিয়ানমার প্রচার করছে একসময় আরাকানের বিস্তৃতি ছিল বাংলাদেশের কুমিল্লা বিভাগ পর্যন্ত। মুঘল শাসনামলে নবাব শায়েস্তা খাঁ আরাকানের রাজার হাত থেকে এ অঞ্চল কেড়ে নেন। তার পর আসে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অধীনে। মিয়ানমারের ঐতিহাসিকেরা স্বীকার করতে চান না যে, আরাকানের রাজারা একসময় ছিলেন গৌড়ের সামন্ত। আমাদের উচিত হবে বিশ্বের কাছে এ অঞ্চলের প্রকৃত ইতিহাসকে তুলে ধরা। না হলে আমরা হারাতে পারি বিশ্ব জনমতের সমর্থন।
লেখক : প্রবীণ শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট

 

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫