ঢাকা, রবিবার,৩১ মে ২০২০

উপসম্পাদকীয়

দৃষ্টিপাত : মাদকাসক্তের বাবার করুণ আকুতি

১৩ মে ২০১৮,রবিবার, ০০:০০


প্রিন্ট

আমি ১৯৭১-এর সশস্ত্র একজন মুক্তিযোদ্ধা। ভারতের উত্তর প্রদেশের দেরাদুন জেলার টান্ডুয়া প্রশিক্ষণ শিবিরে বিএলএফের একজন সদস্য হিসেবে যুদ্ধের ট্রেনিং গ্রহণ করি। আমার বয়স এখন ৭৪ বছর চলছে। আগামী ১০ জ্যৈষ্ঠ পর্যন্ত আল্লাহ তায়ালা বাঁচিয়ে রাখলে ৭৪ বছর পূর্ণ হবে।
নবম শ্রেণীতে পড়ার সময় তদানীন্তন পাকিস্তানের সামরিক শাসক আইয়ুব খানের শিক্ষা কমিশনবিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে ‘খুনি আইয়ুবের গদিতে আগুন জ্বালো একসাথে’ এবং লাথি মারো একসাথে সেøাগানে আমাদের থানা শহর প্রকম্পিত করে তুলেছিলাম আইয়ুব খানের শত শত ফটো ভেঙে। তখন গলায় জুতা বেঁধে মিছিল করেছি। ১৯৭১-এর ২৩ মার্চ হাজার হাজার মানুষের সামনে পাকিস্তানের পতাকা পুড়িয়েছি এবং আমার এক সাথীর হাত দিয়ে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করিয়েছি। ২৫ মার্চ যদি মুক্তিযুদ্ধ শুরু না হতো, তাহলে পাকিস্তানের পতাকা পোড়ানোর অপরাধে আমার কী পরিণতি হতো, সহজেই ধারণা করা যায়।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বা পরবর্তী সময়ে অন্যায় অবৈধভাবে একটি টাকা কারো কাছ থেকে নিয়েছি, এমন নজির নেই। শত ভাগ সৎ জীবনযাপন করতে পেরেছি এতটা দাবি করব না; তবে অন্যায়ভাবে ১০টি টাকা উপার্জন করে পরিবারকে লালনপালন করার কামনা কখনও করিনি। স্বামী-স্ত্রী দুজনে দুটি বেসরকারি উচ্চবিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করে সামান্য আয় দিয়ে কায়কেশে জীবনযাপন করেছি। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, হারাম পয়সা আমার পরিবারে যেন প্রবেশ না করে। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সুখেই রেখেছিলেন। প্রাচুর্য না থাকলেও সচ্ছল জীবনযাপন করতে পারতাম। কিন্তু আমার এ জীবনে ভয়াবহ এক অভিশাপ হানা দিয়েছে এটা আমার পরিবারের সবার জীবনকে বিষাক্ত করে তুলেছে। দুটো মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে অনেক আগেই। আল্লাহ আমাদের সুদর্শন একটি ছেলেও দিয়েছেন। সে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে পদস্থ সরকারি কর্মকর্তা। কিন্তু মর্মান্তিক ব্যাপার হলো, ছেলেটি মাদকাসক্ত। সে আমাদের চোখের সামনে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আমার ছয় বছরের একটি নাতনী ও ছয় মাসের নাতি আছে। ওদের কথা ভেবে দিনরাত মনটা হাহাকার করে উঠছে। অতীত জীবন পাই পাই করে খুঁজি, আমি কি কখনও কোনো মানুষের ক্ষতি করেছি অথবা কারো অমঙ্গল কামনা করেছি? বরং মনে হয় অন্যের স্বার্থের জন্য নিজেরটা ত্যাগ করেছি, আজো তা করি। জীবনে কখনও নেশা করিনি। একসময় ধূমপান করতাম, আমার এই ছেলেরই আপত্তিতে, তা ২২-২৩ বছর আগে ছেড়ে দিয়েছি। তাহলে আমার ছেলে কেন এমন হলো?
স্ত্রীর কথা নাইবা বললাম। ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে স্কুলে সুনামের সাথে সিনিয়র শিক্ষিকা হিসেবে কর্মরত ছিল। তার বেশভূষায় কোনো চাকচিক্য ছিল না। পরিচ্ছন্ন জীবনই তার কামনা। নয়া দিগন্তে ড. রেজোয়ান সিদ্দিকীর ‘ইয়াবা আসছে নৌকা ভরে’ লেখাটা পড়লাম আর হাহাকার করে কাঁদলাম। এই পরিণতির জন্যই কি যৌবনের সব সুখ-স্বপ্ন ত্যাগ করে রাজপথে আন্দোলন সংগ্রাম করে মুক্তিযুদ্ধকে অনিবার্য করে তুলেছিলাম? দেশে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মানুষ মরে। ইয়াবাকারবারিরা পার পায় কিভাবে? অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, শুধু আমি নই হাজার হাজার বাবা তাদের আদরের সন্তানদের মৃত্যু কামনা করছে। কারণ ওরা মাদকাসক্ত। আমার কোথাও আশ্রয় নেয়ার জায়গা নেই। তাই আমার মতো অসহায় বাবা যারা আছেন, আসুনÑ আমরা সবাই মিলে নেশাগ্রস্ত সন্তানদের জন্য পরম করুণাময়ের কাছে প্রার্থনার আয়োজন করি। অদৃশ্য শক্তি আমার সোনার দেশকে ধ্বংস করার জন্য মাদক অস্ত্র ব্যবহার করছে।হ
জনৈক পিতা, ময়মনসিংহ

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫