ঢাকা, শুক্রবার,২৯ মে ২০২০

উপসম্পাদকীয়

নতুন অর্থে চীনের ‘উন্নয়ন’ প্রসারণ

গৌতম দাস

০৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৬,রবিবার, ১৮:৪৪


গৌতম দাস

গৌতম দাস

প্রিন্ট

উন্নয়ন শব্দটা আমেরিকার নেতৃত্বে গড়ে ওঠা বিশ্ব-অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ভেতরের এক বিশেষ ফেনোমেনার নাম। যার অন্তত একটা অর্থ অবকাঠামোগত উন্নয়ন। আমেরিকার নেতৃত্বে বিশ্ব-অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ভেতরের অবকাঠামোগত বিনিয়োগ বাড়ানোর উন্নয়ন। তাহলে, নতুন কোনো গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অর্ডার যদি চলতি আমেরিকার নেতৃত্বের বদলে চীনা নেতৃত্বে শুরু হয় তাহলে নতুন বিশ্ব-অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ভেতরে কী কী নতুন বদল ঘটবে, এবার ‘অবকাঠামোগত উন্নয়ন’ কথাটার অর্থ কি ভিন্ন হবে? চীনারা কি সেটাকেও ‘উন্নয়ন’ নামে ডাকবে? বৈশিষ্ট্যগুলোতে বদল আসবে? নাকি সেটা কেবল ডাকনাম বদলই নয় অর্থ তাৎপর্যেও নতুন বৈশিষ্ট্য আনবে? ওই লেখার শিরোনাম ছিল ‘চীনের বিশ্বব্যাংক, উন্নয়নের অর্থ কি বদলে যাবে’। এবারের প্রসঙ্গটা মূলত সে রকমই কিছুটা তবে ভিন্নভাবে।

গ্লোবাল পলিটিক্যাল ইকোনমিক লিটারেচারে ‘ডেভেলপমেন্ট বা উন্নয়ন’ বলে শব্দটা পরিচিত ও চালু হতে শুরু করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে। এর সাথে আর একটা শব্দও ছিল- ‘রি-কনস্ট্রাকশন’, যেটার বাংলা পুনর্গঠন হতে পারে। ঠিক যেমন ‘রি-কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’। বিশ্বব্যাংক জন্মের সময় কী ধরনের সংগঠন এটা হতে যাচ্ছে তা বুঝানো ও প্রকাশ করাটা মুখ্য ছিল। ফলে ওর নাম ছিল ‘ইন্টারন্যাশনাল ব্যাংক ফর রি-কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’, সংক্ষেপে আইবিআরডি। পরবর্তী সময়ে ১৯৯১ সালে গঠিত ইউরোপীয় ইউনিয়নেরও একই বৈশিষ্ট্যের ব্যাংকের নাম ‘ইউরোপিয়ান ব্যাংক ফর রি-কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’ রাখা হয়েছিল। তবে পপুলার পর্যায়ে সংক্ষেপিত হয়ে সাধারণ্যে শব্দটা আর ‘পুনর্গঠন ও উন্নয়ন’ না থেকে শুধু উন্নয়ন হয়ে যায়। কিন্তু কী সে বৈশিষ্ট্য যার ভেতর উন্নয়ন শব্দের অর্থ লুকানো আছে?
পুনর্গঠন ধারণা বা শব্দটা এসেছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যাওয়া ইউরোপের পুনর্গঠন প্রয়োজনকে বুঝাতে। কিন্তু উন্নয়ন জিনিসটা কী? ‘অবকাঠামোগত উন্নয়ন’ কথাকে সংক্ষেপ করে উন্নয়ন বলা হয়। আগে ছিল এখন ক্ষতিগ্রস্ত এমন অবকাঠামো অথবা নতুন অবকাঠামোর বিস্তৃতি ঘটানোর অর্থে অবকাঠামো উন্নয়ন। কিন্তু অবকাঠামোই বা কী? যেসব সুবিধাদি আগে থেকে থাকলে কারখানা উৎপাদন ও পণ্য চলাচলের ব্যবসা-বাণিজ্য ধরনের অর্থনৈতিক তৎপরতায় প্রচুর দেশী-বিদেশী বাণিজ্যিক বিনিয়োগ আগ্রহী হয়ে এগিয়ে আসে। যেমন একটা স্কুল খোলা, রাস্তাঘাট ব্রিজ করা, বিদ্যুৎ, পানি, পয়ঃপ্রণালী ব্যবস্থা খাড়া করা, ন্যূনতম চিকিৎসার ব্যবস্থা করা, দক্ষ প্রশাসন গড়ে তোলা ইত্যাদি। এগুলো সবই অবকাঠামোগত সুবিধা। অবকাঠামোগত সুবিধাদি থাকলে কারখানা পণ্য উৎপাদন ও পণ্য বিনিময় বাণিজ্যে বিনিয়োগ আকৃষ্ট হয়। অবকাঠামো থাকলে বিনিয়োগ আসে বলে অবকাঠামো গড়াকে কোনো দেশের অর্থনীতিতে গতি আনার ক্ষেত্রে মুখ্য ধাপ মনে করা হয়। কিন্তু অবকাঠামো আর বিনিয়োগ এ ধারণা দুটোর মধ্যে আরেক সম্পর্ক আছে। বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে অবকাঠামো লাগে কথাটি সত্য। কিন্তু অবকাঠামো গড়তেও আবার বিনিয়োগ লাগে। কিন্তু প্রথম বাক্যের বিনিয়োগ যাকে আকৃষ্ট করার জন্য এত আয়োজন সে বিনিয়োগের অর্থ ‘বাণিজ্যিক বিনিয়োগ’। আর অবকাঠামো গড়তে যে বিনিয়োগের দরকারের কথা বলছি সেটাও বিনিয়োগ বটে তবে নামমাত্র বা না-সুদে কেবল সার্ভিস চার্জের ঋণে আনা বিনিয়োগ। তাই দুই বিনিয়োগ ধারণায় যেন বিভ্রান্তি না লাগে তাই প্রথমটা ‘বাণিজ্যিক বিনিয়োগ’ আর পরেরটাকে ‘অবকাঠামোগত বিনিয়োগ’ বলা হয়। ‘অবকাঠামোগত বিনিয়োগ’ জোগাড় করতে পারলে অবকাঠামোগত সুবিধা গড়ে রাখা যায়। অবকাঠামোগত সুবিধা গড়া থাকলে ‘বাণিজ্যিক বিনিয়োগ’ আকৃষ্ট করা যায়।
দুই বিনিয়োগ ধারণার মধ্যে অনেক বিষয়ে ফারাক থাকলেও মূল ফারাক সুদের হারে। অবকাঠামোগত বিনিয়োগেও মুনাফার বিষয় থাকে। কিন্তু তা নামমাত্র বা খুবই কম মুনাফা (অবশ্যই তা এক ডিজিটের সুদে এবং তা সাধারণত ৫%-এর ওপরে তো নয়ই, বরং ১%-এর নিচে হতে পারে) হতে পারে। আর এর মূল উদ্দেশ্য মুনাফা করা নয়। মুনাফা কেমন করে আরো বেশি করা যায় এমন উদ্দেশ্যে এটা পরিচালিতও হয় না। সে জন্য এটা বাণিজ্যিক বিনিয়োগ নয়। তাহলে এর উদ্দেশ্য কী? এর উদ্দেশ্য বরং বাণিজ্যিক বিনিয়োগের বাজারকে বড় করা, এই বিনিয়োগের সুযোগ বাড়ানো; ব্যবসা সহজ করা, বাধা দূর করতে সাহায্য করা। একটা স্কুল খোলা, রাস্তাঘাট-ব্রিজ করা, বিদ্যুৎ, পানি, পয়ঃপ্রণালীর ব্যবস্থা করা, ন্যূনতম চিকিৎসার ব্যবস্থা করা, দক্ষ প্রশাসন গড়ে তোলা ইত্যাদি। এগুলো সবই অবকাঠামোগত বিনিয়োগ এবং বলা বাহুল্য, এগুলো অবাণিজ্যিক। কারণ সমাজের স্কুল যদি দুই ডিজিটের মুনাফার বাণিজ্যিক বিনিয়োগে খোলা হয় তবে এ থেকে বের হওয়া দক্ষ-শ্রমিককে চাকরিতে নিয়োগ দিতে গেলে বেতন দিতে হবে হয়তো ১০ গুণ। আর খুব কমসংখ্যক লোকই এখানে সন্তানকে ভর্তির সামর্থ্য রাখবে। কিন্তু বিপরীতে স্কুল বা শিক্ষায় অবকাঠামো বিনিয়োগে পরিচালিত করা মানে সমাজের অর্থনৈতিক উৎপাদনের দিক থেকে দেখলে দক্ষ শ্রম সহজে সস্তায় পাওয়ার ব্যবস্থা করা।
বাণিজ্যিক বিনিয়োগ আসে গ্লোবাল পুঁজিবাজার ও দেশীয় বিনিয়োগকারীর কাছ থেকে বাণিজ্য ও মুনাফার উদ্দেশ্যে। বিপরীতে অবকাঠামো বিনিয়োগ আসে বহু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানÑ বিশ্বব্যাংক, এডিবি অথবা এ কালের এআইআইবি ধরনের অবকাঠামো ব্যাংকের কাছ থেকে। স্বভাবতই এগুলো বাণিজ্যিক ব্যাংক নয় বলে ব্যক্তি বা কোম্পানি এর মালিক নয়। কেবল অনেক রাষ্ট্রজোট এর মালিক। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের নামের সাথেও ব্যাংক শব্দটা থাকলেও এগুলো বাণিজ্যিক ব্যাংক নয়, তা বুঝাতে নামের মধ্যে ‘উন্নয়ন’ বা ‘অবকাঠামো’ বা ‘পুনর্গঠন’ এমন শব্দ থাকবেই। তাই বিশ্বব্যাংকের নাম ‘ইন্টারন্যাশনাল ব্যাংক ফর রি-কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’, এডিবির নাম এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক। এআইআইবি এর নাম এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক ইত্যাদি। ওপরের ধারণাগুলোকে জড়ো করে পপুলারলি তা এক শব্দে প্রকাশিত হওয়া শব্দ হলো উন্নয়ন। ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ, মুনাফা- এসব পরিচিত ধারণার বাইরে সংযুক্ত হওয়া নতুন শব্দ অবকাঠামো ব্যাংকের বিনিয়োগে অবকাঠামো উন্নয়ন। ইউরোপে এটা এসেছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে। আর আমাদের মতো দেশে আরো অনেক পরে, বাংলাদেশে সত্তরের দশকে।

অবকাঠামো বা উন্নয়নের সাথে নিজের সম্পর্কের ব্যাপারটা আজ গ্রামের মানুষও সহজেই একভাবে নিজের মতো করে বুঝেছে। তার গ্রামে অবকাঠামো বিনিয়োগ এলে তার কাজ বা চাকরি পাওয়া, ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগ সৃষ্টি করা, বাধা অপসারণ ঘটা- এই সম্পর্ক সে বোঝে। তাই মফস্বলের ভাষায় অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ ধারণার পপুলার নাম হলো উন্নয়ন। তার বাড়ি থেকে উপজেলা বাজার, নিজের জেলা শহর বা রাজধানীতে পৌঁছানোর যোগাযোগব্যবস্থা যত সহজ হবে এর সাথে তার ভাগ্য খোলা, জীবনযাপনের মান, কাজ পাওয়া যে সরাসরি সম্পর্কিত এটা বুঝতে তার বাকি নেই। উন্নয়ন কথাটা সে এভাবে তার মতো করে বুঝে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের (১৯১৪-১৮) আগে যেটাকে উপনিবেশ যুগ বা কলোনি শাসনের যুগ বলা হয় সেকালে সারা দুনিয়া ইউরোপের চার-পাঁচটা কলোনি সাম্রাজ্য শাসকের দখলে ভাগ হয়ে গিয়েছিল। এমন কোনো দেশ বাকি ছিল না যে, কলোনি হয়নি; কোনো না কোনো কলোনি সাম্রাজ্য শাসকের দখলে চলে যায়নি। এ সময়টাতেই আমরা যেমন ব্রিটিশ কলোনি সাম্রাজ্য শাসকের দখলে ছিলাম- আমাদের মতো দেশের অর্থনৈতিক উৎপাদনে যা মূলত কৃষি এর সব উদ্বৃত্ত ইউরোপের ব্রিটেনে এসে জড়ো হয়েছিল। এগুলো সঞ্চিত হতে থাকা উদ্বৃত্ত সম্পদ। আরেক দিক থেকে দেখলে এগুলোই আবার বিনিয়োগ পুনঃবিনিয়োগ নামে হাজির হতে সক্ষম। এক কথায় তা ইউরোপের বিনিয়োগ সক্ষমতা। কিন্তু তা সত্ত্বেও কেবল ইউরোপে নিজ নিজ মাস্টারের দেশেই এই বিনিয়োগ সক্ষমতার প্রয়োগ হয়েছিল। কিন্তু আমাদের মতো দেশে ফিরে বিনিয়োগ হতে যোগ্য হলেও তা হয়নি, ব্রিটেনের সাথে আমাদের ‘কলোনি সম্পর্কের’ কারণে। মালিকানা বিদেশের এবং মালিকের ইচ্ছার প্রাধান্যেই সে আমাদের মতো দেশ বিনিয়োজিত হবে- এভাবে ওই বিনিয়োগ যেতে বাধ্য হওয়া বা পরিবেশ সৃষ্টি হওয়ার মতো ঘটনাটা হলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। কারণ ওই যুদ্ধের ফলাফলে সব ওলটপালট হয়ে তত দিনে হিটলারের পতনসহ পুরনো কলোনি মাস্টারদের রুস্তমির দিন শেষ হয়েছে আর সারা ইউরোপে সবার নতুন নেতা, অর্থ ধারদাতা, ত্রাতা হয়ে উঠে এসেছিল আমেরিকা এবং গুরুত্বপূর্ণ যে, আমেরিকা নিজের ভূমিকা সম্পর্কে পরিষ্কার নিশ্চিত ছিল। সেটা হলো, আমাদের মতো দেশের সাথে ব্রিটিশের পুরনো কলোনির মতো সম্পর্ক আর নয়। পুঁজি বিনিয়োগকারী হিসেবে আমেরিকা আমাদের মতো দেশের সাথে সম্পর্কিত হতে পারে। ফলে আমেরিকার নেতৃত্বে গড়ে ওঠা বিশ্ব-পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সম্ভাব্য বিনিয়োগ খাতক হিসেবে আমরা তার জন্য লোভনীয় বিনিয়োগ পুঁজিবাজারের ক্রেতা হতে পারি। আমরা তার ক্রেতা হই এটা আমেরিকার দরকার। এরই প্রাতিষ্ঠানিক তৎপরতা হলো আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক গড়ে ওঠা। আর এর ভেতর দিয়ে লুণ্ঠিত ও পাচার হয়ে যাওয়া উদ্বৃত্ত নানা হাত ঘুরে যা এবার ‘বিনিয়োগ’ নাম নিয়ে কেবল নতুন শর্তে আমাদের মতো দেশে ফিরতে প্রস্তুত। শর্ত হলো ওই উদ্বৃত্ত বা বিনিয়োগের মালিক আমেরিকা। ফলে সে একটা সুদ চায় আর ওর নিজের স্বার্থকে প্রাধান্যে রেখে আমাদেরকে গ্লোবাল পুঁজিবাজারের খাতক হতে দিতে চায়। এর আইনগত দিকগুলো সম্পন্ন হয়েছিল আগেই কিন্তু বাস্তবে বাংলাদেশে এই অবস্থা ফিরে আসতেই সত্তর দশক লেগে যায়। আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক নামের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্য দিয়ে মূলত ওই বিনিয়োগ, মাগনা অনুদান, নামমাত্র সুদের অবকাঠামোগত ঋণ এবং এসবের পরিপ্রেক্ষিতে যতটা আকর্ষণীয় বাজার আমরা হতে পেরেছি সে মাত্রায় বাণিজ্যিক বিদেশী বিনিয়োগ একমাত্র এভাবে এ চেহারা ও শর্তেই কলোনি আমলে লুণ্ঠিত উদ্বৃত্ত নানা হাত ঘুরে ততটুকু বাংলাদেশে ফেরত আসতে পেরেছিল।

আমেরিকার হাতে পড়ে ‘উন্নয়ন’ শব্দটা এভাবে গ্লোবালি ও আমাদের দেশে নতুন অর্থ নিয়ে হাজির হয়েছিল। আবার গ্লোবাল পরিপ্রেক্ষিত থেকে দেখলে, অবকাঠামোগত বিনিয়োগে ‘উন্নয়ন’ কতটা হয়েছে কথাটার অর্থ আমরা গ্লোবাল বাণিজ্যিক বিনিয়োগের নামে কতটা উদ্বৃত্ত ফিরিয়ে আনতে পেরেছি, আমরা কাজে লাগাতে সক্ষম হয়েছি এরই গ্লোবাল সক্ষমতার প্রকাশ। কারণ এ দিয়েই বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে সুনির্দিষ্ট কোনো এক রাষ্ট্রের অর্থনীতিতে কতটা তাল মিলিয়ে চলতে পারছে এর নির্ণায়কও। সম্ভবত এককথায় এভাবে বলা যায়, কলোনি সম্পর্কে ব্রিটিশের হাতে লুণ্ঠিত আমাদের উদ্বৃত্ত এবার আমেরিকার মাধ্যমে এরই যত কিঞ্চিৎ অনুদান, নামমাত্র সুদের অবকাঠামোগত ঋণ এবং বাণিজ্যিক বিদেশী বিনিয়োগ হিসেবে ফেরত এসেছে- এভাবে ফেরত আসাকে আমরা আসলে ‘উন্নয়ন’ বলে বুঝছি। এটাও উন্নয়ন ধারণার আর এক মাত্রা।

ওদিকে, মোটাদাগে চলতি একুশ শতকের শুরু থেকেই নতুন পরিস্থিতি নতুন আলামত দেখা দিতে শুরু করেছিল। ইতোমধ্যে ধীরে ধীরে কিন্তু নিশ্চিতভাবে চীনের অর্থনৈতিক উত্থান ঘটে গিয়েছিল। এর ভিত্তি দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। ফলাফলে নেতৃত্বে বদল। আমেরিকার বদলে চীনের নেতৃত্বের এক নতুন বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থার জন্ম দেয়া ও তা কার্যকর হওয়া শুরু করেছে। আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক নামের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার ভেতর দিয়ে আমেরিকা আমাদের জন্য যা করতে পেরেছে তা হলো, আমরা কেবল পশ্চিমের পণ্যের খাতক না। আমাদের জন্য অন্তত গার্মেন্ট আর একেবারে কাঁচা-মাইগ্রেটেড অদক্ষ শ্রমের রফতানিকারক- এই পরিচয়ে একটা জায়গা করে দিতে সক্ষম হয়েছে আমেরিকা। এতটুকুই। আমেরিকার দেয়া উন্নয়নের অর্থ এর মধ্যেই সীমিত ছিল। ওর বৈশিষ্ট্যগত দিক হলো আবার নিজ বাজারে আমাদের পণ্য প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ আর সামগ্রিকভাবে গ্লোবাল বাজারকে নিজের পক্ষে রাখা।
কিন্তু এবার চীনের নতুন ভূমিকার কারণে চীন ধারণা দিচ্ছে, সে আরো কিছু সম্ভবত পারবে, যেটা আমেরিকার হাতে যা ঘটেছে এত প্রিমিটিভ নয়। এত দিন অবকাঠামো ধারণাটা কোনো একটা দেশের অভ্যন্তরীণ সীমায় সীমাবদ্ধ থাকত। অবকাঠামো গড়ে উঠত গরিব রাষ্ট্রের ভেতরে। চীন পুরনো অবকাঠামো ধারণার ভেতরেই বাড়তি যে নতুন ধারণা হাজির করেছে সেটা ইন্টারন্যাশনাল অথবা আন্তঃরাষ্ট্রীয় বৈশিষ্ট্যের। যেমন এক-বেল্ট-এক-সিল্ক-রোড বিনিয়োগ প্রকল্প। এটা ইউরোপকে সড়কপথে মধ্যপ্রাচ্য হয়ে, মধ্যএশিয়া হয়ে, চীন হয়ে এরপর সারা এশিয়ায় সবাইকে যুক্ত করা। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ওয়েবসাইটে এসব নিয়ে একাডেমিক আলোচনা শুরু হয়েছে। পুরনো বিশ্ব-অর্থনীতিতে গরিব দেশ থেকে কাঁচামাল তুলে নিয়ে যাওয়া, নিজের তৈরি পণ্যের ক্রেতা বানানো এই ব্যবস্থার বদলে এশিয়ার দেশে চীন ওই কাঁচামাল দিয়ে তাদের শিল্প সক্ষমতা বাড়িয়ে দিতে, নিজের ভারী শিল্পগুলোকে স্থানান্তর করে দিতে এবং স্থানান্তরিত কারখানার পণ্য নিজে আমদানি করতে বিনিময়ে আরো জটিল চীনা পণ্যের কিনে নেয়া- এভাবে এগিয়ে যেতে ভীত নয়। এ জন্যই সে আন্তঃরাষ্ট্রীয় বৈশিষ্ট্যের অবকাঠামো প্রকল্প যেমন এক-বেল্ট-এক-সিল্ক-রোড বা কোনো গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্প যা গুচ্ছ কয়েক রাষ্ট্র ব্যবহার করবে, এসবে আগ্রহী।

চীন বাংলাদেশে অবকাঠামোগত খাতে বিপুল বিনিয়োগ করতে সক্ষম ও আগ্রহী এ কথা গত ২০১০ সাল থেকেই জানিয়ে আসছে। বলা বাহুল্য, চীনের দিক থেকে ‘উন্নয়ন’ শব্দের পুরনো অর্থ চীন এখানে নিঃসন্দেহে বদলে ফেলবেই। এসব বিষয়ে আমাদের দিক থেকে এর ভালো-মন্দ অলিগলি বুঝে নেয়ার কাজ আমাদের জন্য পড়ে থাকছে। প্রয়োজন সে দিকে উপযুক্ত আগ্রহে সময় দেয়া।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
[email protected]

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫