ঢাকা, শুক্রবার,২৯ মে ২০২০

উপসম্পাদকীয়

তেলের চাহিদা ফেরার মধ্যেই সবার স্বার্থ

গৌতম দাস

১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৬,রবিবার, ১৭:১২


গৌতম দাস

গৌতম দাস

প্রিন্ট

মানুষের যা কিছু অর্জন অন্য ভাষায় যা তার সভ্যতায় লেখা থাকা গৌরব এমন তালিকাটা হয়তো ছোট নয়। কিন্তু মনে রাখতে হবে মানুষের যে অর্জন তালিকা তৈরি হয়েছে তার প্রায় শতভাগ জীবাশ্ম তেল বা ফসিল ফুয়েলভিত্তিক। অর্থাৎ ফসিল ফুয়েল আছে তাই যেন মানব সভ্যতা আছে। অন্য দিকে আবার ফসিল ফুয়েলের ওপর পরিবেশ ধ্বংসের অভিযোগ এখন সবচেয়ে তীব্র। ফলে ফসিল ফুয়েল ফুরিয়ে গেলে এর বিকল্প জ্বালানি কী হতে পারে তা হয়তো আগামী ২০ বছরের মধ্যে হাজির হয়ে যাবে কিন্তু এখনো সে স্থানটা ফাঁকা। তবে সবাই নিশ্চিত সে জায়গাটা এমন কেউ নেবে যেটা জ্বালানি হিসেবে নবায়নযোগ্য রি-সাইকেলেবল।
অপর দিকে মাটির নিচের সম্পদের ধারণাটাও অদ্ভুত। মাটির নিচের কালো তরল জ্বালানি তেল কোনো রাষ্ট্রের দখলে থাকা, আবিষ্কৃত হওয়া এটা তাদের কোনো ক্রেডিট বা গর্বের বিষয় নয়, এটা তাদের শ্রমলব্ধ কোনো অর্জন নয়। এমনকি এই সম্পদের মূল্য কত এটা নির্ধারিত হওয়ার দিক থেকে ওই রাষ্ট্রের কোনো ভূমিকা নেই। অর্থাৎ মজুদ ওই তেলের মূল্য ওই রাষ্ট্র নির্ধারণ করে না। বরং আন্তর্জাতিক সামাজিক সম্পর্ক যা ওই তেলের বাজার থেকে তার মূল্য নির্ধারণ করে দেয়। আবার কোনো রাষ্ট্র অথবা একাধিক রাষ্ট্র অর্থনীতিতে যত অগ্রগতি উন্নতি করবে বাজারে জ্বালানি তেল ততই বেশি মূল্যবান পণ্য হয়ে উঠবে। অর্থাৎ তেলের মূল্য ততই বড় বাধা হয়ে উঠে আসতে থাকবে। লক্ষ করলে দেখা যাবে, চীনের অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি দু’অঙ্কে বা ১০ শতাংশের ওপরে স্থির হয়ে বেড়ে চলার (১৯৯০-২০১০) এ ২০ বছরের সময়েই জ্বালানি তেলের দাম সর্বোচ্চ ছিল। আবার ধারাবাহিকভাবে প্রবৃদ্ধি যখন সাত ভাগের নিচে নেমে গেল ২০১৪ আগস্ট থেকে তখন তেলের দামের এক উল্টো রাস্তা ধরা শুরু হয়েছিল।
জ্বালানি তেলের বাজারে বিশ্লেষণ-গবেষণা প্রতিষ্ঠান হিসেবে আন্তর্জাতিক এনার্জি এজেন্সি বা আইইএ ওই সময় ইতিবাচক অর্থে খুবই প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান। যদিও এ সংগঠন শুধু পশ্চিমা রাষ্ট্রের স্বার্থ দেখার পক্ষে কাজ করবে বলে মনে করে এর জন্ম দেয়া হয়েছিল ১৯৭৪ সালে। তৃতীয় ও সর্বশেষ আরব-ইসরাইল যুদ্ধের (১৯৭৩) পটভূমিতে ওই যুদ্ধ শেষের দিকে আরব তেল উৎপাদকেরা আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিমের বিরুদ্ধে তেল অবরোধ করেছিল। সে পটভূমিতে কমন স্ট্র্যাটেজিক করণীয় ঠিক করতে এ প্রতিষ্ঠানের জন্ম। ওই অবরোধে পড়ে সে সময়ে নিজের জন্য তেল পাওয়া, সরবরাহ অক্ষুণ্ন থাকার স্বার্থে এ ইস্যুতে পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো সব মিলে এক কমন কৌশলগত অবস্থান নেয়ার তাগিদ অনুভব করেছিল। এর ফলে আন্তর্জাতিক এনার্জি এজেন্সি বা আইইএ নামের গবেষণা প্রতিষ্ঠানের জন্ম হয়। অর্থাৎ ওই জন্ম ছিল পশ্চিমের রক্ষণশীল, গোষ্ঠীগত স্বার্থে দলবদ্ধ থাকার সময়ের ঘটনা। ফলে গরিব অথবা আরব রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বড়লোক উন্নত অর্থনীতির রাষ্ট্রের এক প্রাচীন জোট প্রতিষ্ঠান ওইসিডি’র (অরগানাইজেশন অব ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট) কাঠামোর মধ্যে প্রতিষ্ঠানটির জন্ম হয়। এ কারণে ওইসিডি’র সদস্য না হলে কোনো রাষ্ট্র আইইএ’র সদস্য হতে পারে না। আইইএ’র বর্তমান মোট সদস্য ২৯। তবে পরবর্তী সময়ে এ প্রতিষ্ঠান আর এত রক্ষণশীল থাকেনি। এতে আইইএ’র সদস্য নয় যারা সেসব রাষ্ট্রের জন্য আইইএ’র সদস্য হওয়ার দুয়ার খুলে দেয়া হয়নি বটে, কিন্তু অ-সদস্যদের সাথে কাজের সম্পর্ক, প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতামূলক নিয়মিত কর্মসূচি নিয়ে থাকে। এর মূল কারণ তারা অনুভব করে যে, পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো শুধু তেল রফতানিকারক নয়, কেউ কেউ বেশ বড় বা ক্ষুদ্র অংশে তেল উৎপাদক দেশও। ফলে তেল উৎপাদক, তেল ব্যবহারকারীদের স্বার্থ এবং দুনিয়ার তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়া ইত্যাদির মতো ইস্যুতে তেলবিষয়ক উৎপাদক বা ভোক্তা নির্বিশেষে সবার কমন স্বার্থের দিকও আছে। এ ছাড়া সবার ওপরে আইইএকে যদি নির্ভরযোগ্য তেল বাজার-বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান হতে হয় তবে প্রথমত তাকে মৌলিক ডাটা সংগ্রাহক হতে হবে এবং এ ডাটা লাগবে উৎপাদন সংক্রান্ত এবং ভোক্তা সংক্রান্ত। তবেই সে সামগ্রিকভাবে সেসব তথ্যের বিশ্লেষক হতে পারবে। দুনিয়ার প্রায় ১৯১টি রাষ্ট্রের মধ্যে মাত্র ২৯টি রাষ্ট্র আইইএ’র সদস্য। ফলে কেবল ২৯ দেশ নয়, বাকি রাষ্ট্রগুলোও তেল উৎপাদনবিষয়ক, নইলে অবশ্যই ভোক্তাবিষয়ক সব তথ্যই আইইএ’র দরকার। তাই নিজের গবেষণার জন্য সবার কাছ থেকেই মৌলিক তথ্য সংগ্রহ করা দরকার। এ ছাড়া তেলের ব্যবসায় বিনিয়োগকারী এদের স্বার্থ ঠিক উৎপাদনকারী বা ভোক্তার স্বার্থ নয়। তেল বাজারের স্বার্থ। আইইএ মূলত এ তেল বাজারেরই সবার জন্য মার্কেট ডাটা সরবরাহকারী। এ কারণে আইইএ মাত্র ২৯ সদস্য রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান হলেও আসলে অ-সদস্য প্রায় ১৫০ রাষ্ট্র বা ভিন্ন তেলবিষয়ক জোট (ওপেক) সবার সাথেই সম্পর্ক গভীর ও ব্যবহারিক কাজের দিক থেকে, যেমন বাংলাদেশের জ্বালানিবিষয়ক ডাটাও আইইএ’র সাইটে পাওয়া যাবে।
আইইএ প্রতি মাসে ‘অয়েল মার্কেট রিপোর্ট’ প্রকাশ করে, যেখানে তেলবিষয়ক গ্লোবাল তথ্যের বিশ্লেষণ থাকে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ওই রিপোর্টে তেলের বাজারের গতি-প্রকৃতির এক-দুই বছরের লম্বা সময়ের অভিমুখ ছাড়াও প্রায় ১৮ মাস আগেই চলতি ট্রেন্ড ও পূর্বাভাস কী তা বিশ্বাসযোগ্যতার সাথে হাজির করে থাকে। ফলে তেল বাজারের ছোট-বড় সব বিনিয়োগকারী আইইএ’র ওপর খুবই নির্ভরশীল। একালে তেলের বাজারের চাহিদা সম্পর্কে আগাম বলতে পারা বিশেষত বহুল জনসংখ্যা ও রাইজিং অর্থনীতির চীন ও ভারতের অর্থনীতির গতি-প্রকৃতির ডাটা দেখে সব রাষ্ট্রের তেলের চাহিদা প্রসঙ্গে বলতে পারার দিক থেকে আইইএ’র রিপোর্টকে খুবই নিরপেক্ষ, বিশ্বাসযোগ্য ও সম্মানজনক মনে করা হয়। যেমন- ২০১৪ সালের আগস্টে চীনের জিডিপি প্রথম ৭-এর নিচে নামতে শুরু করলে ওই মাসের আইইএ’র রিপোর্টে পরের অন্তত দুই বছর তেলের চাহিদা কমে যাবে এমন আগাম বিশ্লেষণ প্রকাশিত হয়েছিল। আর তা হওয়া মাত্রই তেলের বাজারের বিনিয়োগকারীরা শেয়ার ধরনের স্পেকুলেটিভ বাজার থেকে বিনিয়োগ প্রত্যাহার শুরু করেছিল। এতে এক কথায় বললে, এভাবে আইইএ কোনো একটা রাষ্ট্র বা কোনো এক রাষ্ট্রজোটের স্বার্থের গবেষণা প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠার বদলে আন্তর্জাতিক তেলের বাজারের গতি-প্রকৃতি ও সামগ্রিক অভিমুখের বিশ্লেষক হয়ে উঠেছে।
গত ৯ ফেব্রুয়ারি আইইএ’র মাসিক অয়েল রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। ওই রিপোর্ট প্রকাশিত হওয়ার পর তেলের দাম আরো ৮ পার্সেন্ট পড়ে গেছে। রিপোর্টে আভাস ছিল যে, ‘চলতি ২০১৬ সালের বাকি মাসগুলো তেলের বাজার অতি উৎপাদনে ছেয়ে থাকবে।’ এ ছাড়া তেলের বাজারে ক্রেতা-বিক্রেতাসহ সব পক্ষ সাধারণভাবে একমত যে, তেলের দাম পড়তির এই ফেনোমেনার প্রধান কারণ চাহিদার তুলনায় অতি উৎপাদন। অন্য ভাষায় বললে, কোনো পক্ষ থেকেই উৎপাদনের লাগাম বা সীমা না টানার কারণে দাম পড়ছেই। আইইএ বলছে, আমেরিকার যে উৎপাদন কমানোর কথা ছিল তা বাস্তবে ঘটতে আরো সময় লাগবে বলে এ অবস্থা। এ ছাড়া আরেকটা কথা, সৌদি নিয়ন্ত্রিত তেল উৎপাদক জোট ওপেক আর নন-ওপেক বড় উৎপাদক রাষ্ট্র রাশিয়ার মধ্যে উৎপাদন কমানোর একটা সমঝোতা হতে পারে বলে বাজারে জোরেশোরে কথা উঠেছিল, যার অর্থ এতে তেলের বাজারে দাম বাড়বে। অন্তত কিছুটা ঘুরে দাঁড়াবে। কিন্তু এমন কথা গুজব বা ঘটার সম্ভাবনা ক্ষীণ বলে হাজির হওয়াতে আইইএ আভাস দিয়ে বলছে, বছরের বাকি সময়টা তেলের অতি উৎপাদনে বাজার ছেয়ে থাকবে।
এ দিকে হঠাৎ করে গতকাল ১৩ ফেব্রুয়ারি তেলের দাম কিছু ঘুরে দাঁড়িয়েছিল। কারণ, আমেরিকার ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল দুবাইয়ের এক মন্ত্রীর উদ্ধৃতিতে জানিয়েছিল তেল উৎপাদক ওপেক রাষ্ট্রগুলো উৎপাদনের সীমা টেনে ধরতে রাজি হতে পারে। যদিও শেষমেশ ওপেকের এমন কোনো সিদ্ধান্ত দেখা যায়নি।
আবার আমেরিকার নিজের তেলের উৎপাদন, চাহিদা ও বাজার বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ ও পূর্বাভাস প্রকাশের প্রতিষ্ঠান হলো আমেরিকান এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন। এ প্রতিষ্ঠানেরও পূর্বাভাস ছিল, আগামী দুই বছর ভোক্তা হিসেবে আমেরিকার নিজের তেলের চাহিদা বৃদ্ধির কোনো সম্ভাবনা নেই। বরং এরই মধ্যে আমেরিকার নিজ ফ্রেকিং অয়েলের উৎপাদন দ্বিগুণ হয়ে গেছে।
অপর দিকে বিশ্ব পুঁজিবাজার ওয়াল স্ট্রিটের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগকারী ও প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান গোল্ডম্যান স্যাসের বাজার বিশ্লেষক এক টিভি সাক্ষাৎকারে বলেছেন, তেলের বাজার ২০ ডলারে নেমে যেতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা করছেন।
এ ছাড়া তেলের বাজারে সবচেয়ে বড় বিনিয়োগের কোম্পানি ভিটল গ্রুপের এক কর্তা ব্লুমবার্গ টিভিতে সাক্ষাৎকার মন্তব্যে বলছেন, ‘এত দিনের মহা আরামের ১০০ ডলারে ব্যারেলপ্রতি তেল বেচার সুখের দিন ভুলে যেতে হবে এবং তা আর কোনো দিনই ফিরে আসবে না। সামনের দিনে তেল ৪০ থেকে ৬০ ডলারের মধ্যে প্রতি ব্যারেল হয়ে থেকে যাবে।’ নিজের এ বক্তব্যের পক্ষে যুক্তি দিয়ে তিনি বলেছিলেন, বিগত ১৫০ বছরে তেলের বাজারের অতি চাহিদা অথবা অতি জোগানের সময় বিবেচনা থেকে বাদ দিলে দেখা যায়, বাকি সময়ে তেল সব সময় ১০ থেকে ৪০ ডলার প্রতি ব্যারেল বিক্রি হয়েছে। ফলে এখন আর এর ব্যতিক্রম হবে না বলে তার মনে হয়।
এর আগে তেলের বাজার প্রসঙ্গে আমার লেখায় আমেরিকার নতুন ধরনের তেলের উৎস ফ্রেকিং অয়েল বা শেল অয়েলের কথা বলেছিলাম। সেই শেল অয়েল এখনকার বাজারে একটা ফ্যাক্টর বটে। তবে আরো বড় ফ্যাক্টরও আছে। যেমন- ইরানের তেল উৎপাদন বাজারে পুনঃপ্রবেশ করেছে। আমেরিকার সাথে পারমাণবিক ইস্যুতে সমঝোতা প্রতিষ্ঠা হওয়ায় ইরান এবার তার নিজের ওপরের অবরোধ উঠে যাওয়ায় নিজ তেল উৎপাদন বাড়িয়েছে, কারণ এখন তেল সে যে কারো কাছে বিক্রি করতে পারে। এটাই বিরাট ফ্যাক্টর। অন্য দিকে সৌদি আরব ও ইরাক নিজ নিজ কারণে তেলের উৎপাদন প্রচুর বাড়িয়েছে।
এ তো গেল বাজারে উৎপাদক বা তেল সরবরাহকারীদের অবস্থা। অপর দিকে তেলের ভোক্তা অর্থনীতির রাষ্ট্র চীন, ভারতসহ এসব অর্থনীতির গতি শ্লথ, শিগগিরই এটা কোনো ভালো দিকে পরিবর্তিত হয়ে আসার সম্ভাবনা নেই বলে পূর্বাভাস মিলছে। এটাকেই সাধারণ ভাষায় বলা হচ্ছে, তেলের দুর্বল চাহিদামুখী এক গ্লোবাল বাজার। এ ছাড়া সবার ওপরে তেলের বাজারকে অতি-উৎপাদনমুখী বা দাম নিম্নমুখী করে রাখার পক্ষে সৌদি আরবের প্রকাশ্য অবস্থান তো আছেই। যেখানে সারকথা হলো, সৌদি সরকার মনে করে, তেলের দাম বাড়লে তেলের বিক্রির বাজার শেয়ারে সৌদিদের নিজের ভাগ কমে যাবে, বাজার হারাবে সৌদি আরব। সেটা ঠেকাতেই সে তেলের মূল্য কমিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বীদের আগেই বাজার ছাড়া করতে চায়। এসব কিছুরই মিলিত ফল তেলের দাম ক্রমেই পড়ে যাওয়া।
সবশেষে এবার বাংলাদেশের ভেতরে তেলের ভোক্তা হিসেবে অবস্থার দিকে তাকিয়ে কিছু কথা। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম প্রচুর কমেছে। কিন্তু তা যতই কমে যাক আমাদের সরকার তাতে অভ্যন্তরীণ বাজারে তেল বিক্রির দাম একচুলও কমায়নি। কোনো দাম সামঞ্জস্য করেনি। বরং শুরুর দিকে একটা যুক্তি সরকার দিত যে, যেহেতু সরকার তেলের দাম কমালেও যানবাহনওয়ালারা সে ক্ষেত্রে বাসভাড়া কমাবে না। এবং এতে তাদেরকে বাধ্য করা যায় এমন যুতসই কোনো মেকানিজমও নেই। তাই সরকার আপাতত অপেক্ষা করছে। এ দিকে অপেক্ষা করতে করতে তা বছর গড়িয়ে দুই বছর হতে চলল। ফলে এর ভেতর যে ঝোঁক লক্ষ করা যাচ্ছে তা হলো, সম্ভবত তেলের দাম ভবিষ্যতে বছরখানেক পরে কিছুটা বেড়ে ৫০-৬০ ডলারের মধ্যে এলেও আন্তর্জাতিক বাজারে ওই কমে থাকা দামটাই থিতু হয়ে যাবে। যত দৃষ্টিকোণ থেকে পূর্বাভাস বা বাজার অভিমুখের বিশ্লেষণ আমরা দেখছি সবই ধারণা দিচ্ছে যে, তেলের দাম শুধু স্থিতিশীলই নয় বরং আরো লম্বা সময়ের জন্যই যেন তা আর না বেড়ে নিম্নমুখী থাকা অবস্থাতেই থিতু হয়ে যাবে। অতএব এর অর্থ বলা যায়, আমাদের অভ্যন্তরীণ বাজারে তেলের দাম কমানোর দাবিটা আর বেশি দিন সরকারের পক্ষে উপেক্ষা করা কঠিন হবে। ২০১০ সালের দিকে যখন রেন্টাল বিদ্যুৎ ঘাঁটি গেড়ে বসতে যাচ্ছিল তখন তা উৎপাদক প্লান্টের মালিকদের কাছ থেকে প্রায় আট টাকা ইউনিট দামে কিনে নেয়ার চুক্তি হয়েছিল। আর সেই সাথে ওই উৎপাদকদের সরকার থেকে ভর্তুকিতে ফার্নেস অয়েল সরবরাহের চুক্তি করা হয়েছিল। সে সময় ভর্তুকি দিয়ে সরকারি তেল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন প্রচুর লোকসান দিয়েছিল, ইসলামি ডেভেলপমেন্ট থেকে বাণিজ্যিক সুদে সাড়ে ১৭ হাজার টাকা ঋণ করেছিল গত দু’বছরে, করপোরেশন সেসব লোকসান কাটিয়ে এখন ভালো রকম লাভের ঘরে উঠে এসেছে। ইদানীং শোনা যাচ্ছে, ১১টি রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ কোম্পানিকে এখন সরাসরি জ্বালানি তেল আমদানির অনুমতি দেয়া হয়েছে। এ দিকে বর্তমানে ফার্নেস অয়েলের উৎপাদন খরচ ২৫ টাকা লিটার, যদিও বর্তমান বিক্রয় মূল্য ৬২ টাকা। এ অবস্থায় সরকার চাইলে বিদ্যুৎ দামের বাড়তি মূল্যের হাত থেকে সহজেই কারখানা বা বাসাবাড়িসহ সব ভোক্তাকেই মুক্তি দিতে পারে। তবে তেলের দাম নিম্নমুখী হলেও এটা অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়াবে না। বিশেষ করে যেসব উৎপাদন রফতানির জন্য আমরা করে থাকি। কারণ তেলের মূল্য থেকে পাওয়া রাজস্ব কমে যাওয়ায় তেল উৎপাদক রাষ্ট্র এবং যারা আমাদের পণ্যের ক্রেতা এদের অর্থনীতি শ্লথ হয়ে গেছে বলে তা আমাদের প্রভাবিত করবে। ফলে তেলের দাম কমে যাওয়ার সুবিধা আমাদের রফতানির জন্য উৎপাদন বাজারে আমাদের জন্য কোনো উল্লেখযোগ্য বাড়তি সুবিধা আনবে না।
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
[email protected]

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫