ঢাকা, শুক্রবার,২৯ মে ২০২০

উপসম্পাদকীয়

নাগরিকের ‘রাষ্ট্রদ্রোহ’ না রাষ্ট্রের মানবাধিকার লঙ্ঘন

গৌতম দাস

২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৬,রবিবার, ১৮:০৯


গৌতম দাস

গৌতম দাস

প্রিন্ট

জওয়াহেরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় বা সংক্ষেপে জেএনইউ দিল্লিতে ভারতের সম্মানজনক এক বিশ্ববিদ্যালয়। গত ৯ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়টির নির্বাচিত ছাত্র সংসদের সভাপতি কানহাইয়া কুমারকে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে পুলিশ গ্রেফতার করেছে। সাধারণ ছাত্রছাত্রী এবং বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি মনে করছে এটা অন্যায় এবং মোদি সরকারের এই পদক্ষেপ বাড়াবাড়ি। তাই এর বিরুদ্ধে সেই থেকে ধারাবাহিকভাবে ছাত্রছাত্রীরা ধর্মঘট-আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। কংগ্রেসের নেতা রাহুল গান্ধী, বামজোট সিপিএমের নেতা সীতারাম ইয়াচুরি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এসে এই আন্দোলনের সাথে সংহতি জানিয়ে গেছেন। কিন্তু ২০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কানহাইয়া কুমারের জামিন হয়নি। ইতোমধ্যে তার বর্ধিত রিমান্ড শেষ হয়েছে। কিন্তু কয়েক দিন দিল্লির পাতিয়ালায় আদালতপাড়া যাতায়াত করার সময় এক অবাক করা মারাত্মক কাণ্ড ঘটেছে। আদালতপাড়ায় পুলিশের হেফাজতে থাকা আসামি কানহাইয়া বিজেপি ও সঙ্ঘ পরিবারের সমর্থকদের হাতে মার খেয়েছেন। আর শুধু তিনি নন, তার বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু, শিক্ষক এমনকি সাংবাদিকেরাও সেখানে মার খেয়েছেন পরপর দু’দিনই। আনন্দবাজার পত্রিকা লিখেছে, ‘চলতি সপ্তাহে পাটিয়ালা হাউজ কোর্টে পরপর দু’দিন বিজেপি এবং সঙ্ঘ পরিবারের সমর্থকদের হাতে মার খেয়েছিলেন জেএনইউয়ের শিক্ষক, ছাত্রছাত্রী এমনকি সাংবাদিকেরাও। বুধবার পুলিশি ঘেরাটোপে থাকা সত্ত্বেও আক্রান্ত হন কানহাইয়া, যা দেখে শিউরে ওঠে পুলিশ কমিশনারের কাছে রিপোর্ট তলব করে শীর্ষ আদালত। এরপরই সরাসরি সুপ্রিম কোর্টে জামিনের আবেদন করার সিদ্ধান্ত নেন কানহাইয়ার হয়ে মামলা লড়তে আসা সোলি সোরাবজি, রাজু রামচন্দ্রন, রাজীব ধবনের মতো প্রবীণ আইনজীবীরা।’

কিন্তু সরাসরি সুপ্রিম কোর্টে জামিন চাওয়াতে হিতে বিপরীত ঘটে গেছে। কানহাইয়ার উকিলেরা আদালতে কানহাইয়ার নিরাপত্তা ও পাটিয়ালা হাউজ কোর্টের অস্বাভাবিক পরিস্থিতির যুক্তি দেখিয়ে তাদের হাহকোর্টও ফেলে সরাসরি সুপ্রিম কোর্ট আসার কারণ ব্যাখ্যা করেন। কিন্তু বিচারপতিরা বলেন, ওই জেলা আদালতের ‘অস্বাভাবিক’ পরিস্থিতি সম্পর্কে তারাও অবহিত। কিন্তু সে ক্ষেত্রে হাইকোর্টে যাওয়া উচিত ছিল। কানহাইয়ার আইনজীবীরা যুক্তি দেন, পাটিয়ালা হাউজ কোর্ট ও দিল্লি হাইকোর্ট একই চত্বরে। তাই তারা নিরাপত্তার অভাব বোধ করছেন। সরকারি আইনজীবীরা পাল্টা বলেন, হাইকোর্টে নিরাপত্তার সমস্যা নেই। বিচারপতিরা তখন বলেন, ‘সুপ্রিম কোর্টই একমাত্র নিরাপত্তা দিতে পারে, বাকি আদালত পারে না- তারা এমন কোনো বার্তা দিতে চান না। আর এতে সবাই কিছু হলেই সরাসরি সুপ্রিম কোর্টেই জামিন চাইতে আসার জন্য উৎসাহিত হয়ে যাবে। বিচারপতিদের কথায় যুক্তি আছে অবশ্যই। কিন্তু এ থেকে ভারতের খোদ রাজধানীর এক জেলা আদালতের পরিস্থিতি সম্পর্কে যে ধারণা পাওয়া গেল তা ভয়ঙ্কর। বাংলাদেশের আদালতপাড়ায়ও নানা সমস্যা আছে সন্দেহ নেই। কিন্তু জামিন চাইতে এসে হেফাজতে থাকা আসামি এবং আসামির উকিলকে সরকারি দলের হাতে মার খেতে হয়েছে, এটা আমরা এখনো কল্পনা করতে পারিনি।

তবে সুপ্রিম কোর্ট মামলা না শুনলেও দিল্লির পুলিশের ওপর নিরাপত্তা দেয়ার নির্দেশ জারি করার পর নিরাপত্তা পরিস্থিতি বদলে গেছে। এমনকি শুধু নির্দেশ নয়, এ বিষয়ে কেন্দ্রের সলিসিটর (অ্যাটর্নি) জেনারেল রঞ্জিত কুমারের কাছ থেকে রীতিমতো আশ্বাস আদায় করে নিয়েছেন বিচারপতিরা। অর্থাৎ জায়গা আর ঠিক সময়মতো ধরতে পারলে ভারতের বিচার ব্যবস্থায় ‘মার খাওয়ার’ বিরুদ্ধে প্রতিকার আছে।

ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারও যে এমন ন্যাক্কারজনক হামলার পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে রাজধানীর পুলিশ কমিশনারকে ব্যবহার করে তা দেখে আমরা বেশ পুলকিত হতে পারি এই ভেবে যে, আমরা ভারতের চেয়ে বেশি খারাপ নই। রাজধানী হলেও দিল্লি এক জেলা শহর বটে, তবে দিল্লি অন্তত কাশ্মির নয় বলে যে ধারণা আমাদের ছিল কানহাইয়ার জামিনবিষয়ক রিপোর্ট পড়ে সে ধারণা বেশ চোট পায় বৈ কি! যেমন আনন্দবাজার থেকে তুলে আনা আরো কিছু অংশ ‘জেএনইউয়ের ঘটনায় মোদি সরকার, বিজেপি-সঙ্ঘ পরিবারের পাশাপাশি আঙুল উঠেছে দিল্লির পুলিশ কমিশনার বি এস বসসীর দিকেও। বুধবার আদালত চত্বরে কানহাইয়াকে মারার ঘটনা বেমালুম অস্বীকার করে গিয়েছিলেন বসসী। কিন্তু রাতে তিহার জেলে বুকে ব্যথা অনুভব করেন কানহাইয়া। তাকে রামমনোহর লোহিয়া হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানকার মেডিক্যাল রিপোর্টে বলা হয়েছে, কানহাইয়ার নাক, উরুসহ বিভিন্ন জায়গায় আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনও জানিয়েছে, আদালত চত্বরে পুলিশের সামনেই কানহাইয়ার ওপর হামলা সংঘটিত এবং তা পূর্বপরিকল্পিত। তার ওপর মানসিক চাপ দেয়া হয়েছিল বলেও ওই রিপোর্টে বলা হয়েছে’। যাক এ রিপোর্ট স্বব্যাখ্যাত তাই কিছু বলার নেই। কেবল একটা বিষয়- ভারতের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বাংলাদেশের মতোই দাঁত-নখহীন এমন ধারণা করা একেবারেই ভুল হবে। এমনকি ভারতের আদালতের রিপোর্ট ও অবজারভেশন বিশাল গুরুত্ব রাখে।
কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রসংসদের সভাপতি কানহাইয়া কুমারের নামে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা কেন? আর এত তোলপাড়ের কারণই বা কী?

এর শুরু ভারতীয় দখলে থাকা কাশ্মিরের এক বাসিন্দা আফজাল গুরুর ঘটনা থেকে। তিনি একজন বিচ্ছিন্নতাবাদী অ্যাক্টিভিস্ট, আদালতের এই ত্রুটিপূর্ণ ও বিতর্কিত রায়ের সূত্রে সঙ্গোপনে তার ফাঁসি হয়ে গেছে তিন বছর আগে- জেএনইউ-তে তারই স্মরণে গত ৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ এক সভার আয়োজন করা হয়েছিল। আফজাল গুরুর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল তিনি ও তার সাথীরা ২০০১ সালে ভারতীয় পার্লামেন্ট ভবনে সশস্ত্র আক্রমণ করেছিল, যেখানে পাঁচজন আক্রমণকারীসহ ১৪ জনের মৃত্যু হয়েছিল। পরে ২০১৩ সালে আদালতের ওই মামলার রায় বের হওয়ার পর দেশ-বিদেশের মানবাধিকার গ্রুপগুলো আফজাল গুরুর বিচারকে মিথ্যা বা ভুল অভিযোগে ত্রুটিপূর্ণ ব্যবস্থায় দেয়া রায়ে ফাঁসি কার্যকর হয়েছে মনে করে থাকে। আর ওই ফাঁসির পরদিনই এ বিষয়ে ভারতের মানবাধিকার লঙ্ঘনের কড়া ক্রিটিক অরুন্ধতি রায়ের এক ক্রিটিক্যাল লেখা ছেপেছিল লন্ডনের গার্ডিয়ান ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৩-এ। তবে বিজেপির কেন্দ্রীয় সরকার, বিশ্ববিদ্যালয় বিজেপির ছাত্র সংগঠন ও বিজেপিঘেঁষা মিডিয়ার দাবি যে, ওই দিনের জেএনইউ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্মরণসভা থেকে ভারতবিরোধী স্লোগান দেয়া হয়েছে। সে কারণে ক্যাম্পাসে পুলিশ প্রবেশ করেছে, ছাত্রদের শক্ত হাতে ঠেঙ্গিয়েছে আর বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি কানহাইয়া কুমারসহ সাতজনকে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
তাদের বিরুদ্ধে বিজেপি-মিডিয়ার ভাষ্য হলো, তারা ভারত ‘কাশ্মির দখল করে রেখেছে’, ‘ভারত ধ্বংস (ভারত কা বরবাদি তক) হয়ে যাওয়া পর্যন্ত কাশ্মিরের স্বাধীনতা (আজাদী) আন্দোলন চলবে’ ইত্যাদি স্লোগান দিয়েছে যেগুলো দেশদ্রোহী স্লোগান। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং টুইটারে লিখেছেন, তিনি ‘এন্টি ন্যাশনাল এলিমেন্টদের বিরুদ্ধে অ্যাকশনে’ যেতে দিল্লি পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছেন। আর বিশ্ববিদ্যালয়ে রেইড দেয়া ছাড়াও ‘অ্যান্টি ন্যাশনাল স্লোগান’ দেয়ার জন্য দেশদ্রোহিতার অভিযোগে মামলা দিয়েছেন। আলজাজিরার দিল্লি ব্যুরো চিফ লিখেছেন, রাজনাথ বলেছেন, ‘কেউ যদি ভারতবিরোধী স্লোগান দিয়ে থাকে জাতির সার্বভৌমত্ব ও সংহতিকে চ্যালেঞ্জ করে এটা সহ্য ও বরদাশত করা হবে না’। ও দিকে এর পাল্টা উদার রাজনীতির (লিবারেল) বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের বক্তব্য হলো, ‘সরকার ভিন্নমত অধিকার ছিনিয়ে নিচ্ছে’, ‘তারা মুক্ত চিন্তার ওপর আক্রমণ করছে’, ‘নিরীহ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা টার্গেট হয়েছে’ ইত্যাদি।

এর এক দিন পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং অভিযোগের ক্যাম্পেইন প্রপাগান্ডা আর এক ধাপ চড়িয়ে ছিলেন। তিনি টুইটে দাবি করলেন ওই স্লোগান তোলার ঘটনায় পাকিস্তানের সন্ত্রাসী সংগঠন লস্করই তৈয়বার প্রধান নেতা হাফিজ সাঈদয়ের মদদ ছিল। পশ্চিমবঙ্গের আনন্দবাজার পত্রিকা এ প্রসঙ্গে শিরোনাম করে লিখেছিল এটা ‘তিলকে তাল করা’। রাজনাথ দাবি করলেন ‘জনগণকে বুঝতে হবে’ হাফিজ সাঈদ পাকিস্তান থেকে ওই দিনের কর্মসূচিকে সমর্থন করার জন্য আহ্বান রেখেছেন। কিন্তু পরদিন জানা গেল ওই কথিত বিবৃতি পাকিস্তানের হাফিজ সাঈদের নয়, আসলে ওই নামে একটা নকল বেনামি অ্যাকাউন্টের। দিল্লি পুলিশ এটা নিশ্চিত করল। আবার খোদ হাফিজ সাঈদ পাকিস্তান থেকে নিজে বিবৃতি দিয়ে এটা অস্বীকার করলেন। কিন্তু ততক্ষণে রাজনাথ সিং প্রপাগান্ডা করার যা কিছু সুখ পাওয়া যায় তা কামাই করে নেন।

ভারতীয় পেনাল কোড বা আইপিসির ‘সেকশন ১২৪এ’ হলো সেডিশন-বিষয়ক (বৈধ সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ) অপরাধের ধারা। এই পেনাল কোড ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশে একই। কারণ ব্রিটিশ কলোনিয়াল আমলে ১৮৬০ সালে এই পেনাল কোড চালু হয়েছিল। ফলে ওই তিন দেশই এখনো সেই একই পেনাল কোড অনুসরণ করে থাকে। সেডিশন ধারার মূল অভিযোগ হলো ঠিক রাষ্ট্র নয়, সরকারের বিরুদ্ধে গণদাঙ্গাহাঙ্গামা সৃষ্টি করা বা উসকানি দেয়া। এই অর্থে এটা আইনানুগ সরকার-দ্রোহিতার অপরাধ। তবে লিগ্যাল শব্দ হিসেবে এটা ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’ নয় বা ‘দেশদ্রোহী’ নয়; যদিও পপুলারলি আমরা এমনটা বলে থাকি।

ভারতের বিচার বিভাগ বহু সেডিশনের অভিযোগের (আইনানুগ সরকারের বিরুদ্ধে দ্রোহিতার অপরাধ) মামলা নাকচ করে দিয়েছেন। সেডিশনের মামলায় কোনো অভিযোগ প্রকৃত বলে টিকে গেছে এমন মামলার সংখ্যা খুবই কম। এসব মামলার রায়ে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে শুধু বক্তৃতা দিলেই সেখানে সেডিশন হয়েছে বলে তা বিবেচিত হবে না যদি না ওই বক্তৃতার ফলে দাঙ্গাহাঙ্গামা সৃষ্টি হয়, জনশৃঙ্খলা এটি ব্যাঘাত করে থাকে। ফলে ভারতের বিভিন্ন পত্রিকা সেসব মামলার রেফারেন্স দিয়ে রিপোর্ট করেছে। ভারত নিপাত যাক, শুধু এমন স্লোগান দিলেই সেটাকে সেডিশনের অভিযোগ হিসেবে নিতে ভারতের আদালত রাজি নয়। বহু আগে থেকেই এমন মামলাগুলো আদালত নাকচ করে দিয়েছে। কিন্তু তবু নিজ সরকারের বিরোধীদের হেনস্তা করতে সরকারগুলো রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা দেয়া বন্ধ করেনি। এ ব্যাপারে ভারত-পাকিস্তান-বাংলাদেশের কোনো সরকার কারো চেয়ে কম যায়নি।

গত ২০১৪ সালের মে মাসে বিজেপির মোদি সরকার বিপুল জনসমর্থনে ক্ষমতায় এসেছিল। ওই নির্বাচনে বিজেপি নিজস্ব জোটবদ্ধতার সমর্থন ছাড়াও একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করেছিল। বিপরীতে কংগ্রেসের আসনসংখ্যা ভারতের কেন্দ্রীয় সংসদে মোট ৫৪০ আসনের মধ্যে হয়ে যায় ৫০-এরও নিচে, মানে ১০ শতাংশ আসনেরও কম। সিপিএমের অবস্থা আরো খারাপ। কিন্তু সেই থেকে মোদি সরকারের বয়স প্রায় দু’বছর পার হলেও কোনো ইস্যুতে জনগণ সরকারের বিরুদ্ধে চলে গেছে এমনটি ঘটেনি। তবে কোন রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে মোদির দলের শোচনীয় পরাজয় হয়েছে এমন রেকর্ড আছে। কিন্তু ওই সব আঞ্চলিক বা রাজ্যের নির্বাচনে কংগ্রেসের ভূমিকা কোনো বড় নির্ধারকের নয়। বাম জোটের গোনায় ধরে না গুরুত্ব পায় না অবস্থা। ফলে কংগ্রেস ও সিপিএম অনেক মরিয়া হয়ে অনেক দিন থেকে খুঁজছিল যেকোনো ইস্যুতে খাড়া হয়ে যাওয়া যায় কি না। কংগ্রেস বা বামজোটের সিপিএমের দিক থেকে তাকিয়ে বললে তারা সম্ভবত এই প্রথম কিছু আশার আলো দেখতে যাচ্ছে। কারণ, এটা কেবল জেএনইউ নয়, ভারতের বহু বিশ্ববিদ্যালয়েই ছাত্রছাত্রীরা এই আন্দোলনের পক্ষে সাড়া দিচ্ছে। ছড়িয়ে পড়েছে। আর ঠিক ততটাই মোদি সরকারের পক্ষে কঠিন হয়ে গেছে যে, এটা যে আসলেই একটা আইনানুগ সরকারদ্রোহিতার বা সেডিশন অপরাধ হয়েছে তা জনগণকে বিশ্বাস করানো। জনগণের কাঠগড়া ছাড়াও ও দিকে আদালতের কাঠগড়ায়ও মোদি সরকার সেডিশন প্রমাণ করতে পারবে না সে আলামতও পরিষ্কার হচ্ছে।

আবার সরকারের দিক থেকে বাংলাদেশের সরকারের সাথে এ জায়গায় মোদি সরকারের মিল খুব বেশি। ক্ষমতাসীনদের রাজনৈতিক-বিরোধী ভিন্ন রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তিকে সেডিশনের অভিযোগ দিয়ে ঘায়েল করা, সস্তা প্রচার-প্রপাগান্ডা চালানোর ব্যাপারে ওখানে মোদি সরকার আর এখানে বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে খুবই মিল। যেমন মুক্তিযুদ্ধে ‘৩০ লাখ’ ইস্যু অথবা ডেইলি স্টারের মাহফুজ আনামের মাফ চাওয়ার ইস্যু এগুলোকে রাষ্ট্রদ্রোহিতা বা সেডিশনের অভিযোগে ঝুলিয়ে দেয়া, পাকিস্তানি মনোভাব, পাকিস্তানি চিন্তা ইত্যাদি শব্দটা জড়িয়ে প্রপাগান্ডা করা ইত্যাদির ব্যাপারে দুই সরকারের মিল ব্যাপক। এ ধরণের অভিযোগ তোলার পেছনের অনুমান হলো জনগণ আসলে খুবই বোকা, তাদের বিবেচনাবোধ নেই, তারা আবেগি এই মনে করা হয়ে থাকে।

আবার জেএনইউ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকদের মতো ভারতের ইন্টেলিজেনশিয়াদের লিবারেল রাজনৈতিক অবস্থানের দিক থেকে দেখলে মনে হবে, তারা যে লিবারেল রাজনৈতিক অবস্থান বজায় থাকা আশা করে, কথায় কথায় রাষ্ট্রদ্রোহিতা মামলা দায়ের বা হেনস্তা করা হবে না এমন রাজনীতি চায় তার আসল ধারক কিন্তু কংগ্রেস বা সিপিএম নয়। কাশ্মির বা কোথাও হিউম্যান রাইটস ভায়োলেশনের অভিযোগে ছাত্র-শিক্ষকেরা দাঁড়িয়ে গেলেই তাতে কংগ্রেস বা সিপিএমের সমর্থন পাবে ব্যাপারটা তেমন সরল নয়। সাধারণভাবে বললে, ভারতের রাজনীতিতে এখনো হিউম্যান রাইটস ভায়োলেশনের ইস্যুর চেয়েও প্রায়োরিটি হলো উগ্র জাতীয়তাবাদের ইস্যু। বিশ্ববিদ্যালয়ের সামর্থ্য নেই ‘মেরা ভারত সবসে মহান হায়’- এই বোধ পেরিয়ে এর ওপর দিয়ে হিউম্যান রাইটস ভায়োলেশনের ইস্যুকে অ্যাড্রেস করতে পারে। ফলে জওয়াহেরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের কানহাইয়া কুমারের ইস্যুটা যতটা না হিউম্যান রাইটস ভায়োলেশনের বিষয়ে যতটা না এই ইস্যুতে ভারতের ইন্টেলিজেনশিয়াদের লিবারেল রাজনৈতিক অবস্থানের সাথে কংগ্রেস-সিপিএমের ঐক্য তার চেয়েও বরং এটা ‘সাম্প্রদায়িক বিজেপি’ বিরোধিতায় ছাত্র-শিক্ষকদের সাথে কংগ্রেস-সিপিএমের সেকুলারিজমের অ্যালায়েন্স। আরো স্পষ্ট করে বললে, কাশ্মির এখনো এখানে কংগ্রেসের কাছে হিউম্যান রাইটস ভায়োলেশনের ইস্যু নয় বরং বিজেপি বিরোধিতার ইস্যু। এ জন্য যেকোনো হিউম্যান রাইটস ভায়োলেশনের ইস্যুতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টেলিজেনশিয়ার সাথে কংগ্রেস বা সিপিএম জাতীয় রাজনৈতিক দলের অ্যালায়েন্স বা কাজের জোট সম্পর্কের উদাহরণ খুবই কম। দিল্লিতে জওয়াহেরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় যত খুশি তোলপাড় হয়ে যাক না কেন মনে রাখতে হবে এটা কাশ্মিরের কোনো হিউম্যান রাইটস ভায়োলেশনের ইস্যু নয়, এ ইস্যুতে ছাত্র-শিক্ষকদের সাথে কংগ্রেসের কোনো রাজনৈতিক ঐক্যের ইস্যু এটা নয়। কাশ্মিরবাসীর পক্ষে দাঁড়ানোও নয়। আজ হয়তো আদালতে কানহাইয়ার জামিন হবে আশা করা যায়। তবে সেই সাথে কোর্টপাড়ার নতুন কোনো তামাশা দেখব না এটাই আশা করি।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
[email protected]

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫