Naya Diganta

রাজনীতির গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা

মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান

৩০ মার্চ ২০১৮,শুক্রবার, ০০:০০


ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রব্যবস্থায় মুসলিম তার ব্যক্তিগত জীবনে ধর্ম পালনে স্বাধীন থাকলেও বৈষয়িক জীবন অনৈসলামি আইনে শাসিত হয়। সুদ-ঘুষের পুঁজিবাদী অর্থনীতি কিংবা রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদের সমাজবাদী অর্থনীতি অনুস্মরণের ফলে মুমিনের রুজি হারাম রুজিতে পরিণত হয়। অন্য দিকে, দেশের আদালতগুলোতে ইসলামী বিধান অনুযায়ী বিচারব্যবস্থা না থাকায় অনেক ক্ষেত্রে নিরপরাধ দণ্ডিত হয় আর অপরাধী খালাস পেয়ে যায়। ফলে আইনের প্রতি অশ্রদ্ধা ও মুমিনকে ইসলামী খিলাফত প্রতিষ্ঠায় সাধ্যমতো চেষ্টা করতে হয়। কারণ ইসলামী খিলাফত শুধু মুসলিমের জন্য নয়, বরং খিলাফতের অধীনে বসবাসরত সব নাগরিকের জন্য সমানভাবে কল্যাণকর। ইসলাম যেমন কোনো দল বা সম্প্রদায়ের জন্য নির্দিষ্ট নয়, ইসলামী খিলাফতও তেমনি নির্দিষ্ট কোনো সম্প্রদায়ের নিজস্ব বিষয় নয়, বরং আল্লাহর বান্দাদের জন্য আল্লাহ প্রেরিত বিধান সর্বজনীন, যা সবার জন্য মঙ্গলময় ও সবার প্রতি সমানভাবে প্রয়োগযোগ্য। যেমনÑ আল্লাহর সৃষ্ট আলো-বাতাস, মাটি ও পানি সবার জন্য কল্যাণকর। মানবজীবনের উন্নতি অগ্রগতির সাথে রাজনীতির সম্পৃক্ততা বিবেচ্য হয়। সমাজ ও দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে রাজনীতি প্রধান ভূমিক পালন করে থাকে। এ জন্য ইসলাম বিশেষভাবে এর প্রতি গুরুত্ব দিয়েছে।
আদর্শ বাস্তবায়ন করার জন্য রাজনীতি অপরিহার্য : জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর দেয়া জীবনবিধান পরিপালন করতে হলে রাজনৈতিক শক্তির প্রয়োজন। ইসলামের কিছু বিধান রয়েছে, যা রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত ছাড়া পালন করা সম্ভব নয়। যেমনÑ হত্যা ও অঙ্গহানির বিধান, চুরি ও ব্যভিচারের শাস্তি ইত্যাদি। সে জন্য যুগে যুগে নবী ও রাসূলগণও আল্লাহর দ্বীন কায়েমে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন ‘তিনি তোমাদের জন্য দ্বীন বিধিবদ্ধ করে দিয়েছেন; যে বিষয়ে তিনি নূহকে নির্দেশ দিয়েছিলেন, আর আমি তোমার কাছে যে ওহি পাঠিয়েছি এবং হজরত ইবরাহিম, মূসা ও ঈসাকে যে নির্দেশ দিয়েছিলাম তা হলোÑ তোমরা দ্বীন কায়েম করবে এবং এ থেকে বিচ্ছিন্ন হবে না। তুমি মুশরিকদের যেদিকে আহ্বান করেছ, তা তাদের কাছে কঠিন মনে হয়; আল্লাহ যাকে চান তার দিকে নিয়ে আসেন। আর যে তাঁর অভিমুখী হয়, তাকে তিনি হিদায়াত দান করেন।’
রাজনীতি সমাজের বিভিন্ন নীতি-বিধি পরিবর্তনকারী শক্তি : সমাজ থেকে অপসংস্কৃতি, কুসংস্কার, অন্যায়-অবিচার দূর করার জন্য অন্যতম শক্তি হলো রাজনৈতিক শক্তি। এ জন্য আমাদের প্রিয় নবী একটি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দিয়ে সাহায্য করার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করছিলেন। আল-কুরআনে বলা হয়েছে, ‘আর বলো, হে আমার রব, আমাকে প্রবেশ করাও উত্তমভাবে এবং বের করো উত্তমভাবে। আর তোমার পক্ষ থেকে আমাকে সাহায্যকারী শক্তি দান করো।’
রাজনীতির মাধ্যমে যা সম্ভব, অন্যভাবে তা সম্ভব নয় : রাজনীতি এমন অনেক কল্যাণকর কাজ করা সম্ভব, যা অন্য কিছু দিয়ে সম্ভব নয়। এ জন্য তৃতীয় খলিফা উসমান রা: বলেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহ তায়ালা রাষ্ট্রশক্তির সহায্যে এমন অনেক কাজ সম্পন্ন করেন, যা কুরআন দ্বারা করান না’।
ইসলামী রাজনীতি আল্লাহর শাস্তির বিপরীতে রক্ষাকবচ : সমাজ ও রাষ্ট্রে যখন অন্যায় কাজ ব্যাপকভাবে চলতে থাকে, গোনাহর কাজে কোনো বাধা দেয়া না হয়, তখন আল্লাহর পক্ষ থেকে লানত ও বিভিন্ন গজব নেমে আসে। তাই অন্যায় ও গোনাহের কাজ প্রতিরোধ ও ন্যায় ও কল্যাণ কর্মের প্রবৃদ্ধির জন্য ইসলামী রাজনীতি চর্চা অপরিহার্য। যেমনিভাবে বনি ইসরাঈলদের ওপর এসেছিল। আল্লাহ তায়ালা বলেন, বনি ইসরাইলের মধ্যে যারা কুফরি করেছে, তাদের দাউদ ও মরিয়ামপুত্র ঈসার মুখে (ভাষায়) অভিশাপ দেয়া হয়েছে। কারণ অবাধ্য হয়েছে এবং সীমা লঙ্ঘন করত। তারা পরস্পরকে মন্দ থেকে নিষেধ করত না, যা তারা করত তা থেকে। তারা যা করত তা কতই না মন্দ! এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বিশিষ্ট মুফাসসির ইবনে কাসির রহ: বলেন, গোনাহ ও হারাম কাজ থেকে বিরত রাখতে তাদের জন্য তাদের কেউ নিষেধ করত না। তারা যে ধরনের পাপে লিপ্ত ছিল, তা থেকে বিরত রাখার জন্য তাদের নিন্দা করা হয়েছে। সমাজে যখন পাপাচার, খারাপ কাজ চলতে থাকে, আর কোনো ভালো কাজের আদেশ দেয়ার মতো লোক না পাওয়া যায়, তখন সবার ওপর আল্লাহর গজব নেমে আসে। সেখান থেকে কেউ রক্ষা পায় না। এ বিষয়ে হাদিসে এসেছে, উবাইদুল্লাহ ইবন জারির রা: তার থেকে বর্ণনা করেন, ‘রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, যখন সমাজে অন্যায় ও পাপাচার চলতে থাকে, তখন যদি ক্ষমতাধর ব্যক্তিরাও তাতে বাধা না দেয়, তবে আল্লাহ তায়ালা সবার ওপর শাস্তি দেন।
সব ধরনের জুলুমের হাত থেকে মুক্তির জন্য রাজনীতি : রাজনীতি না থাকলে সমাজের বিভিন্ন স্তরে জুলুম-নির্যাতন ব্যাপকতা লাভ করে। এমতাবস্থায় সমাজের সম্মানিত ব্যক্তিরা অসম্মানিত ও লাঞ্ছিত হন এবং জুলুমের শিকার হন। এ জন্য আল্লাহ তায়ালা জালিমদের থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দিয়েছেন, আর যারা জুলুম করেছে; তোমরা তাদের প্রতি ঝুঁকে পড়ো না; অন্যথায় আগুন তোমাদেরও স্পর্শ করবে এবং আল্লাহ ছাড়া তোমাদের কোনো অভিভাবক থাকবে না। অতঃপর তোমরা সাহায্যপ্রাপ্ত হবে না। আর তোমরা ভয় করো ফিতনাকে, যা তোমাদের মধ্য থেকে বিশেষভাবে শুধু জালিমদের ওপরই আপতিত হবে না। আর জেনে রাখো, নিশ্চয় আল্লাহ আজাব প্রদানে কঠোর। এই আয়াতের ব্যাখ্যায় প্রখ্যাত মুফাসসির মুহাম্মদ আল-আমিন আশ-শানকিতি তার তাফসিরে লিখেছেন, এ আয়াতে উল্লিখিত ফিতনা (যা জালিম এবং অন্যদেরও গ্রাস করে) দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছেÑ মানুষ যখন কোনো অন্যায় কাজ দেখে; কিন্তু তাতে বাধা দেয় না, তখন আল্লাহ ব্যাপকভাবে ভালো-খারাপ সবার ওপর শাস্তি প্রেরণ করেন। এভাবেই আলেমরা এই আয়াতের ব্যাখ্যা এবং সহিহ হাদিসগুলোর এই ব্যাখ্যার পক্ষেই সাক্ষ্য বহন করে।
কুরআন-সুন্নাহ সংরক্ষণে ইসলামী রাজনীতি অনস্বীকার্য : ইসলামী রাজনীতি অনুপস্থিতিতে নানাভাবে সমাজে বিপর্যয় ও অশান্তি সৃষ্টি হয়। ইসলামী রাজনীতির অনুপস্থিতি থাকলে নিজের স্বার্থ রক্ষায় শাসকরা দেশ ও জাতির জন্য কল্যাণকর নয়; এমন আইন তৈরিতেও দ্বিধাবোধ করে না এবং আইন তৈরি করতেও আর কোনো বাধা থাকে না। এমনকি কুরআন-সুন্নাহপরিপন্থী আইন প্রণয়ন করলেও বাধা দেয়ার মতো সামাজিক শক্তি থাকে না।
আল-কুরআনে বলা হয়েছে, ‘তুমি কি তাদেরকে দেখনি, যারা দাবি করে যে, নিশ্চয় তারা ঈমান এনেছে তাঁর ওপর, যা নাজিল করা হয়েছে তোমার প্রতি এবং যা নাজিল করা হয়েছে তোমার পূর্বে। তারা তাগুতের কাছে বিচার নিয়ে যেতে চায় অথচ তাদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে তাকে অস্বীকার করতে। আর শয়তান চায় তাদের ঘোর বিভ্রান্তিতে বিভ্রান্ত করতে। উপর্যুক্ত সংক্ষিপ্ত আলোচনায় বোঝা গেল, ইসলামে রাজনীতির গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য।
লেখক : প্রবন্ধকার

Logo

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,    
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫